তানি সালমান রেজা
১০ জুলাই, ঢাকাঃ বর্তমানে মেয়েদের মধ্যে ওভারিয়ান সিস্ট রোগের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে । প্রাথমিকভাবে ওভারিয়ান সিস্ট নিয়ে ভয়ের কিছু নেই । তবে এর ফলে ডিম্বাশয়ে ক্যান্সার হবার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই মেয়েদের ওভারিয়ান সিস্ট -এর আদ্যোপান্ত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত ।
ওভারিয়ান সিস্ট কী?
ডিম্বাশয় মহিলা প্রজনন পদ্ধতির অংশ। ওভারিয়ান সিস্ট হল ওভারি বা ডিম্বাশয়ের ওপর অবস্থিত একটি জলপূর্ণ থলি। এটি গর্ভের উভয় পাশের নিচের পেটে অবস্থিত। মহিলাদের দুটি ডিম্বাশয় রয়েছে। কখনও কখনও, একটি ফুসকুড়ি ভরাট কোষ ওভারির উপর বৃদ্ধি পায়। এটি হল ওভারি সিস্ট। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওভারি সিস্ট বেদনাদায়ক এবং কোন উপসর্গ দেখা যায় না। সিস্টের মাপ সাধারণত এক মিলিমিটার থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। সিস্ট সম্পর্কে জানা আবশ্যক কারণ এগুলি হরমোনের প্রধান উৎস যা শরীরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য যেমন স্তন, শরীরের আকৃতি, এবং শরীরের চুলের বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
কীভাবে ওভারিয়ান সিস্ট তৈরি হয়?
যখনই কোন মহিলা পিরিয়ড চলাকালীন ডিম্বাণু নিঃসরণ করেন তখনই ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট সেল তৈরি হয়। কোনও ডিম্বাণু সম্পৃক্ত হলে বা নিষেকের উপযোগী হলে এই সেলগুলি ভেঙে যায়। যদি সিস্টগুলি আকারে এক মিলি মিলিমিটার হয়, তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি তারা বড় হয়, তবে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে সেক্ষেত্রে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা আবশ্যক।

কতধরনের ওভারিয়ান সিস্ট হয়?
ফাংশনাল সিস্টঃ সাধারণত বেশির ভাগ নারীর ক্ষেত্রে ফাংশনাল সিস্ট হয়ে থাকে।ওভারি থেকে ডিম না ফুটলে অথবা ডিম ফোটার পরও ফলিকলগুলো চুপসে না গেলে সিস্ট সৃষ্টি হতে পারে।
পলিসিস্টিক (পিসিওএস) সিস্টঃ ওভারিতে যে ছোট ফলিকল থাকে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ না হলে পলিসিস্টিক সিস্ট হয়।
এন্ডমেট্রিওটিক সিস্টঃ ওভারিতে যে টিস্যুগুলো থাকে সেই টিস্যুগুলো যদি জরায়ু ছাড়া পেটের অন্য কোথাও হয়ে থাকে তখন তাকে এন্ডমেট্রিওটিক সিস্ট বলা হয়। এগুলো ডিম্বাশয়ে এমনিতেই থাকতে পারে এবং বেশি পরিমাণ থাকতে পারে।
ডারময়েড সিস্টঃ এই সিস্ট চামড়া, চুল, দাঁত এও হতে পারে। এটিও সচরাচর থাকে। এর ফলে ক্যানসার হতে পারে।
সিস্ট এডোনোমাঃ ডিম্বাশয়ে এক ধরনের তরল জাতীয় পদার্থই জমাট বেঁধে এই ধরনের সিস্ট হয়।
ওভারিয়ান সিস্টের কারণ কী?
এন্ড্রোমেট্রিওসিস, গর্ভধারণের সময় নানা হরমোনজনিত সমস্যা, হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বা পেলভিক সংক্রামণের কারণে সিস্ট হতে পারে। মূল কারন হল অনিয়মিত হরমোন নিঃসরণ। অন্যান্য কারন স্বাস্থ্যের অবস্থার মধ্যে নিহিত থাকে। যেমন- ফাইব্রইয়েড অথবা এন্ড্রোমেট্রিওসিস, যা একজন মহিলার ওভারিয়ান সিস্ট হওয়ার অনুকুল অবস্থা। সাধারণত সিস্টগুলি এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়, কিন্তু ওভ্যুলেশনের জন্য নিয়মিত ঔষুধ ব্যবহার করলে এই সিস্ট জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
ওভারিয়ান সিস্টের লক্ষণগুলি কী কী?
শারীরিক কিছু লক্ষন দেখে বোঝা যেতে পারে ওভারিয়ান সিস্ট হয়েছে কিনা, তবে অনেকের লক্ষন থাকে না। লক্ষনগুলি হলঃ
১) পেটে ব্যথা, পেটে বা শ্রোণীচক্রে হাল্কা ব্যথা, বিশেষ করে যৌনসম্পর্কের সময়।
২) জরায়ু থেকে রক্তপাত, মাসিক শুরুর প্রথমে বা চলার সময়ে বা শেষে ব্যথা; অনিয়মিত মাসিক, অথবা অস্বাভাবিক রক্তপাত।
৩) পেট ভরে থাকা, ভারি লাগা, চাপ লাগা, পেট ফোলা, বা পেট ফাঁপা।
৪) যখন ডিম্বাশয় তে একটি সিস্ট ফেটে যায়, তলপেটের একপাশে হঠাৎ ও তীব্র ব্যথা হতে পারে।
৫) অতিরিক্ত মূত্রত্যাগ এবং সহজতায় পরিবর্তন অর্থাৎ মূত্রথলি সম্পূর্ণরূপে খালি করায় অক্ষমতা, অথবা সংলগ্ন শ্রোণীচক্র এ চাপের কারণে বাওয়েল মুভমেন্ট এ অসুবিধা।
৬) অবসাদ, মাথাব্যাথা ইত্যাদি দেখা যেতে পারে।
৭) বমি ভাব লাগতে পারে বা বমি হতে পারে।
৮) ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে।
৯) স্তনের শিথিলতা দেখা দিতে পারে।
১০) কোমরে টানা ব্যথা করতে পারে।
অন্যান্য উপসর্গগুলি সিস্টের কারণের উপর নির্ভর করতে পারে:
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিসিওসি) এর কারণে সিস্ট হলে যে লক্ষণগুলি দেখা যায় সেগুলি হল মুখের লোম অথবা শরীরের লোম, ব্রণ, স্থূলতা এবং অনুর্বরতা বৃদ্ধি পাওয়া।
এন্ডোমেট্রিওসিস এর কারণে সিস্ট হলে মাসিকের সময়ে শরীর ভারি লাগতে পারে এবং যৌনসম্পর্ক বেদনাদায়ক হয়।

ওভারিয়ান সিস্টের চিকিৎসা কী?
ওভারিয়ান সিস্টের চিকিৎসা সিস্টের বিভিন্ন আকারের উপর নির্ভর করে যেমন – সাইজ, সিস্টের ধরণ, মহিলার বয়স, সাধারণ স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতে গর্ভাবস্থার পরিকল্পনা ইত্যাদি।
সামান্য হলেও ওভারিয়ান সিস্ট থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে। যাদের মেনোপজের সময় এগিয়ে আসছে তাঁদের ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই ধরণের আশঙ্কা থাকলে প্রথমেই আলট্রাসোনোগ্রাফি করা প্রয়োজন। আলট্রাসোনোগ্রাফি রিপোর্ট বলে দেবে কোন পর্যায়ে আছে সিস্ট বা তা থেকে টিউমার তৈরির কোনও আশঙ্কা আছে কি না।
যতক্ষণ না সিস্ট খুব বড় হয় অথবা বৃদ্ধি না ঘটে, ততক্ষণ ডাক্তার সাধারণত পরামর্শ দেয় অপেক্ষা করার জন্য। কারণ তারা দেখে এটি চিকিৎসা ছাড়া সেরে যায় কিনা। অনেক সময় দেখা যায় অনেক সিস্ট চিকিৎসা ছাড়াই দ্রবীভূত হয়ে যায়। তবে সিস্ট যদি বৃদ্ধি হতে শুরু করে অথবা বড় হয়ে যায় তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা করাতে হবে।
রূপশ্রী/টিআর







