বাংলার প্রথম মহিলা জমিদার রাণী ভবানী

6523

মীম সাবিহা সাবরীন :

রাণী ভবানীর নাম কম বেশি সবার কাছে পরিচিত। বাংলার ইতিহাসে রাণী ভবানী এক উজ্জল নাম। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা জমিদার। রাজশাহীর জমিদারির হলেও নাটোরের রাণী ভবানী হিসেবেই তিনি খ্যাতিমান। তৎকালীন সুবাহ বাংলার প্রায় অর্ধেকাংশ ছিল রাজশাহী রাজ বা জমিদারির অংশ। বাকি অর্ধাংশ ছিল বার ভুইয়াদের জমিদারি বা রাজত্ব। রাণী ভবানীর জমিদারী বিস্তৃত ছিল বাংলাদেশের বর্তমান নাটোর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুস্টিয়া, যশোর, রংপুর জেলাসহ বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ পর্যন্ত। নাটোর ছিল তার জমিদারির রাজধানী। বাংলাদেশের বর্তমান নাটোর জেলায় জমিদার বাড়ি হিসেব রাণী ভবানীর একটি বাড়ি এখনো বিদ্যমান আছে, যা পর্যটকদের কাছে একটি দশর্নীয় স্থান।

নাটোর দিঘাপাতিয়া জমিদার বাড়ি এখন উত্তরা গণ ভবন।
রাণী ভবানীর প্রাসাদ

ইংরেজ লেখক হলওয়েলের বিবরণ অনুযায়ী রাণী ভবানীর জমিদারী এস্টেটের বার্ষিক খাজনা ছিল প্রায় ৭ লক্ষ রুপী এবং বার্ষিক অর্জিত রাজস্ব ছিল প্রায় ১৫ লক্ষ রুপী। এই বিশাল জমিদারী পরিচালনার দক্ষতা ও জনহিতকর কাজ করেই নিজের প্রজা বাৎসল্যের কারণে তিনি জনগণের কাছে ‘রাণী’ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি প্রায় ৩৮০ টি উপশনালয়, অতিথিশালা দাতব্য চিকিৎসালয় নির্মাণ করেছেন। তিনি জনকল্যাণকর এবং ধর্মীয়কাজের জন্য ভূমি ও অর্থ প্রদান করতেন। তিনি জমিদারির বিশাল অংশ ব্রাক্ষ্মণদেরকে লাখেরাজ সম্পত্তি হিসেবে দান করেছেন। তিনি হিন্দু টোল, পাঠশালা প্রতিষ্ঠাসহ শিক্ষা বিস্তারের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মুসলমান প্রজাদের বিষয়ে তিনি ছিলেন উদার। জনহিতৈষী রাণী হিসেবে প্রজাদের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি মোগল শাসক ও ইংরেজ বেনিয়া গোষ্ঠীর কারোরই বিরাগ ভাজন হননি তিনি। এভাবেই সুদীর্ঘ ৪০ বছর সাফল্য ও দক্ষতার সাথে তিনি বাংলার সমাজ ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে ‘মহারাণীর’ সুখ্যাতি অর্জন করেন। তবে সাফল্যের এই অভিযাত্রা কুসমার্স্তীণ ছিলনা। এরমধ্যে তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে, খুবই ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ সময়। মুগলদের সুবেহ বাংলা পতন ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর উত্থানের সময়টাও তিনি দৃঢ়তার সাথে ও দাপুটে জমিদার হিসেবেই অতিক্রম করেন।

ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী,

ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, তখন ভারতবর্ষে ও বাংলায় চলছিল মুগল শাসন। বাংলা তখন মুগলদের ১২তম সুবাহ। তখন মুর্শিদ কুলি খান ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব। তিনিই মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুপরবর্তী প্রথম স্বাধীন নবাব। তার উপর মুঘল সাম্রাজ্যের নামমাত্র আধিপত্য ছিল, সকল ব্যবহারিক উদ্দেশ্যেই তিনি বাংলার নবাব ছিলেন। রাণী ভাবানীর জন্মের এক বছর পর ১৭১৭ সালে মোগলরা সুবাহ বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা (তৎকালীন জাহাঙ্গীর নগর) থেকে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়। ১৭৪০ সালে নবাব আলীবর্দী খান বাংলার রাজসিংহাসনে আরোহন করেন। মুগল আমলে উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারি লাভ করা যেতো না। এজন্য উপঢৌকন পাঠিয়ে আনুগত্য স্বীকার করে নিজ নামে স্বতন্ত্র সনদ নেওয়ার রেওয়াজ ছিল। ঐতিহাসিকভাবে বাংলার নবাবদের সাথে নাটোরের জমিদারির ছিল ঐতিহাসিক সম্পর্ক।

রাণী ভবানী জমিদারি লাভ করেন ১৭৪৮ সালে। এসময় তার জমিদারির সীমানা বা সন্নিহিত এলাকায় ঘটতে থাকে ইতিহাসের পালাবদলের নানা ঘটনা। তিনি প্রত্যক্ষ করেন, সুবাহ বাংলার নবাবদের সাথে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরোধ, সংঘাত ও যুদ্ধ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ, বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ দৌলার পতন। মীর জাফর আলী খানের বেঈমানি ও তার পরিণতি। ১৭৬৫ সালে বাংলায় মোগল শাসনের অবসান। দিল্লীর ফরমান বলে তখন বাংলার দিউয়ানি লাভ করেছে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। রাণী ভবানী ঠান্ডা মাথায় কোম্পানী শাসন শুরুর এই ধকলটাও ভালোভাবেই মোকাবেলা করেন। কোম্পানীর আমলেও তিনি সাফল্যের সাথে জমিদারি পরিচালনা করেন। রাণী ভবানী জমিদারি ত্যাগ করেন ১৭৮৮ সালে। তখন বাংলায় চলছিল ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠা আয়োজন। তার জমিদারির সময়টা ছিল রাজনৈতিকভাবে খুবই ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ সময়। কিন্তু তিনি দক্ষতার সাথে সকল প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় সফল হন। রাণী ভবানী জমিদারি পরিচালনায় সামাজিক ও জনহিতকর কাজের জন্য তার জমিদারির বিরাট আয় জনসেবায় এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় করতেন। তিনি ব্রক্ষ্মাচর্য ব্রত পালন করতেন।

প্রাক কথন: মুগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের (১৭০৭) মৃত্যুর পর ভারতের রাজধানী দিল্লীতে কন্দ্রীয় রাজ শক্তির অবক্ষয় শুরু হয়। এসময় মসনদের উত্তরাধিকার নিয়ে দিল্লীতে দ্বন্ধ-সংঘাত দেখা দেয়। ফলে সাম্রাজ্যে মুগল সম্রাটের কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে শুর করে। তারই সূত্রে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছিল নানা অস্থিরতা। সুবাহ বাংলা রাজধানীতে চলছিল প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। আর বাইরে চলছিল ইংরেজদের অবাধ বাণিজ্য তৎপড়তা ও সূতানটিসহ বাংলার বিভিন্নস্থানে অবৈধভাবে জমিদারদের ভূমি দখল করে কুঠি নির্মাণ। এসব দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বাংলার নবাবের কাছে প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণ চাইছিলেন জমিদাররা। ওদিকে ইংরেজ বণিকরা দিল্লী থেকে নিয়ে আসছিলেন নানা ফরমান। কার্যত তখন বাংলায় কোম্পানির অভ্যুদয় পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল। এসময় বাংলার উত্তর সীমান্তে চলছিল মারাঠাদের সাথে বাংলার নবাবের লড়াই। অপরদিকে নবাবের ফরমান উপেক্ষা করে টাকশাল ও কুঠি নিমার্ণ বন্ধ করতে লড়তে হচ্ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে। এছাড়া বাংলার দক্ষিণ পূর্বাংশে চলছিল ফিরিঙ্গী ও মগদের জলদস্যুতা। এমন এক অস্থির পরিস্থিতির কারণে বাংলার জমিদার ও অভিজাত শ্রেণীর ওপর একদিকে বাংলার নবাবের নির্ভরশীলতা বাড়ছিল অপরদিকে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ।

ইতিহাসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, নাটোরের জমিদারের মতো স্থানীয় বড় জমিদাররা তখন নিজেদের জমিদারি রক্ষার পাশাপাশি প্রজাদের জানমাল ও সমাজের শান্তি শৃখলা রক্ষায় নানা কৌশল নিয়ে চলতে হতো। ফলে তারা ক্ষমতার সংঘাতের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল রেখে তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করত। জমিদারদের এই সুযোগটি নেয়ার কারণও ছিল। জমিদাররা জানতো, মুগলরা কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক কোন পর্যায়েই বড় কোন সেনাবাহিনী পুষত না। মুগলদের দিল্লীতে আছে সম্রাটর রাজকীয় বাহিনী। যার প্রধানকে বলা হতো ‘মসনবদার’। কোনো কোনো আস্থাভাজন জমিদার আবার ব্যক্তিগতভাবে মুগল সম্রাটর এসব রাজকীয় বাহিনীর মনসবদারদের কর্মকর্তার তালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত থাকতেন। তাদের এ সেবার জন্য তাদের (মর্যাদা অনুপাতে) জায়গির মঞ্জুরির করা হতো। এছাড়া মুগল শাসকরা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় যে থানা প্রথার প্রচলন ছিল, এসব থানার থানেদার ও ফৌজদারের নেতৃত্বে ছোট ছোট বাহিনী ও সীমান্ত চৌকির সর্দারের নেতৃত্বে ছোট ছোট বাহিনী থাকতো। জমিদাররা তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না করলেও থানা ও সীমান্তের দায়িত্বশীলদের সাথেও স্থানীয় জমিদারিদের প্রশাসনিক সম্পর্ক ছিল। কারণ থানা ও সীমান্তের দায়িত্বশীলরা বিদ্রোহ দমন বা জলদস্যুদের দমনে জমিদারদের সামরিক সাহায্য-সহায়তার ওপর অনেকখানি নির্ভর করতে হতো। আবার আনুগত্য ও চুক্তি অনুযায়ী জমিদারদেরকেও মোগল সেনাবাহিনীর জন্য রসদ ও পাইক পেয়াদা বরকান্দাজ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর যোগান দিতে হতো। জমিদারি রক্ষার চুক্তির কারণে এ বিষয়ে তারা দায়বদ্ধ ছিল। এসময় স্থানীয় জমিদাররা কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক সরকারের দুশমনদের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিতে বিশেষভাবে সহায়তা করতো। এছাড়া জলপথের লড়াইয়ে স্থানীয় জমিদাররাই ছিলো মোগল বাহিনীর শক্তি। তাই সুবাহ বাংলার মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের মোকাবেলা করার জন্যও মুগল বাহিনী ছিল জমিদার নির্ভর। এজন্য বড় জমিদারাদের নিজ নিজ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাজস্ব প্রেরণের নিরাপত্তা ও প্রজাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য সীমিত সামরিক জনবল ও স্থাপনা রাখতে পারতেন। বাংলার নবাবি আমলের দুর্যোগের সময় এ থানাগুলি ক্রমান্বয়ে এক চেটিয়া জমিদারি তালুকগুলির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

জমিদার কেন রাজা বা রাণী:সাধারণত বলা হয়ে থাকে, প্রজা বাৎসল্যের কারণে নাটোরের জমিদার প্রজাদের কাছে ছিলেন ‘মহারাণী’ ভবানী। ইতিহাস বলে, মুগল শাসকদের অধীনে জমিদাররা যত না রাজস্ব সংগ্রাহক প্রতিনিধি ছিলেন তার চেয়েও বেশি ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা বা রাজপুরুষ। আঠারো শতকে বাংলায় ছোট ছোট ভূস্বামীদের স্থলে বিশাল জমিদারির উদ্ভব ঘটে। ছোট জমিদার বা ভূস্বামীদেরকে জমিদারদের উপর নির্ভরশীল তালুকদারের মর্যাদায় অবনমিত করা হয়। এসব বড় জমিদারদের মাধ্যমেই  সরকারের রাজস্ব আদায় হতো তাই তাদের বড় বড় উপাধী দেয়া হতো ‘রাজা’, ‘রাণী’, ‘মহারাজা’, ‘মহারাণী’। এসময় বড় জমিদাররা নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন নামে ভিন্ন ভিন্ন পরিধির অনেক তালুক সৃষ্টি করতেন। ইতিহাসে এমন কিছু তুরুকের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, জঙ্গলবাড়ি তালুক, মাজকুরি তালুক, শিকিমি তালুক ইত্যাদি। এটা ছিল জমিদারি পরিচালনার এক ধরনের কৌশল ও সুবিধা আদায়ের ফন্দি। অন্যদিকে বিশেষ উদ্দেশ্যে জমিদারির নিজস্ব তহবিল গঠনের রাজস্ব নীতি হিসেবেও এ তালুকগুলি সৃষ্টি করা হতো। অনেকে এই তহবিল থেকে ভোগ বিলাসে মত্ত হতেন। তহবিল বৃদ্ধির জন্য প্রজাদের উপর জুলুম নির্যাতন করতেন। তবে রাণী ভবানী এই তহবিল থেকে নানা রাস্তাঘাট-নিমার্ণ, শিক্ষা বিস্তারসহ জনহিতকর কাজ করতেন বলে জনগণ তাকে জমিদার নয় রাণীর মর্যাদায় ভালোবাসতেন।

জমিদাররা বাংলার পল্লী অঞ্চল থেকে খাজনা আদায় ও ক্ষেতের ফসল রক্ষায় রায়ত বা প্রজাদের সহায়তা করার জন্য প্রতিপালন করতেন পাইক-পেয়াদা। যেমন ‘গ্রাম সরঞ্জামি পাইক’। বড় বড় জমিদারদের নিয়মিত পাইক-পেয়াদার বাহিনী ছিল। মুগল থানা পদ্ধতির আওতায় তাদেরকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণ করা হতো। থানা ছিল বৃহত্তম ইউনিট আর এর আওতায় ক্ষুদ্র ইউনিটগুলির নাম ছিল চৌকি কিংবা ফাঁড়ি। ‘গ্রাম সরঞ্জামি পাইক’রা রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতার পাশাপাশি এলাকায় চোর-ডাকাত ধরা, শান্তি রক্ষা এবং হাট-বাজার ও মেলার মতো জনসমাগমের স্থানগুলিতে আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়ীত্ব পালন করতো। রাণী ভবানীর জমিদারির এলাকার প্রজারা এজন্য তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিল।

রাণী ভবানী রাজশাহীর জমিদার: ইতিহাসের বিভিন্ন জায়গায় নাটোরের রাণী ভবানী হিসেবে তার নাম উল্লেখিত হলেও তিনি শুধু নাটোর নয়, ছিলেন রাজশাহীর জমিদার। ৩৩ হাজার ৬৭০ বর্গ কিমি আয়তন বিশিষ্ট এই জমিদারি ছিল বাংলায় দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারি। এজন্য রাজশাহীর জমিদারিকে বলা হতো রাজশাহী রাজ । আঠারো শতকের গোড়ার দিকে বাংলার নেতৃস্থানীয় এই জমিদারির পত্তন হয়। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামকান্তের মৃত্যুর পর রাণী ভবানী এই জমিদারি লাভ করেন।

রাজশাহী জমিদারি সৃষ্টির কথা: বাংলার দিউয়ান বা সুবাহদার নবাব মুর্শিদকুলী খানের সময় (১৭০৪-১৭২৭) রাজশাহীর জমিদারির পত্তন হয়। মুর্শিদকুলী খান ছিলেন নিয়মানুবর্তীতায় দৃঢ় ও কঠোর অনুশাসনের দৃষ্টান্ত। তিনি বাংলায় চালু করে ছিলেন সুষ্ঠু রাজস্বনীতি। তার নীতি ছিল ফসলী জমির খাজনা দিতে হবে, অনাবাদি জমির খাজনা নেই। এছাড়া নদী-খাল-বিল বিধৌত বাংলার ভূ-প্রকৃতির কারণে নবাব এখানে ছোট ছোট জমিদার ও তালকদারদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে জটিলতা প্রত্যক্ষ করেন। তাই তিনি বৃহৎ জমিদারি সৃষ্টির মাধ্যমে বকেয়ার ভারি বোঝা কমিয়ে নিয়মিত ও সহজে রাজস্ব আদায়ের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তার এই রাজস্বনীতির দ্বারা লাভবান হয় রাজশাহী জমিদারি বা নাটোর রাজ। অবশ্য তার এই নীতির ফলে অনেক বনেদি জমিদার যথাসময়ে সরকারি রাজস্ব প্রেরণে ব্যর্থতার দায়ে তাদের জমিদারি হারান। এছাড়া অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের কারণেও অনেক জমিদার ক্ষমতাচ্যুত হন। নবাব মুর্শিদকুলী খান সেসব জমিদারি নিজের অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে ইজারা দেন। এ প্রক্রিয়ায় সর্বাপেক্ষা লাভবান হয় রাজশাহী জমিদার (নাটোর রাজ)।

রাজশাহী রাজপরিবারের আদিপুরুষ জনৈক কামদেব রায়। তিনি ছিলেন পুঠিয়া জমিদার দর্পনারায়ণের অধীনে লস্করপুর পরগনার অন্তর্গত বরাইহাটির তহসিলদার। কামদেবের ছিল তিন পুত্র রামজীবন, রঘুনন্দন ও বিষ্ণুরাম। এ তিন ভাইয়ের মধ্যে রঘুনন্দন ছিলেন সর্বাপেক্ষা সম্ভাবনাময় ও উদ্যমী। রঘুনন্দনের উত্থানের পেছনে ছিল পুঠিয়ার জমিদার দর্পনারায়ণ এবং মুর্শিদকুলী খানের রয়েছে বিশেষ অবদান।

পুঠিয়ার রাজা দর্পনারায়ণ বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরে (ঢাকা) নিজের ওয়াকিল বা প্রতিনিধি হিসেবে রঘুনন্দনকে নিযুক্ত করেন । ঢাকায় তখন মুর্শিদকুলী খানের সঙ্গে সুবাহদার  আজিম-উস-শানের কলহ চলছিল। এসময় রঘুনন্দন মুর্শিদকুলী খানের পক্ষাবলম্বন করে তার বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠেন। এরপর বাংলার ‘দিউয়ানি সদর দফতর’ যখন ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়, তখনও দর্পনারায়ণের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সেখানে নিয়োগলাভ করেন। রঘুনন্দন নিজের কর্মদক্ষতায় শীঘ্রই মুর্শিদাবাদের সদর কানুনগোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয় ও আইনশাস্ত্রে রঘুনন্দনের গভীর জ্ঞানের জন্য সদর কানুনগো তাকে নিজের সহকারী বা নায়েব কানুনগো নিযুক্ত করেন। এ সময় তিনি মুর্শিদকুলী খানের আরও সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান এবং তার বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করেন।

নবাব মুর্শিদকুলী খানের বিশ্বাসভাজন হিসেবে রঘুনন্দন ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম নিজের ভাই রামজীবনের নামে রাজশাহীর একটি অংশের জমিদারির বন্দোবস্ত নিতে সক্ষম হন। পরবর্তিতে বানুগাছির জমিদারের অদক্ষতা ও রাজস্ব প্রদানে ক্রমাগত বকেয়া ফেলায় তিনি জমিদারি হারান। বানুগাছির জমিদারিও রামজীবনের জমিদারির সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৭১১ ও ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দে ক্রমান্বয়ে আরো যুক্ত হয় ভাটুরিয়া পরগনা ও রাজশাহীর বাকি অংশ। এরপরে নলদী পরগনাও রামজীবনের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। ইতোমধ্যে রামজীবন তার দক্ষ জমিদারি পরিচালনা ও নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করে নবাবের বিশ্বাস অর্জন করেন।  এদিকে পার্শবর্তী ভূষণার জমিদার সীতারাম বিদ্রোহী হয়ে সদরে রাজস্ব পাঠানো বন্ধ করলে মুর্শিদকুলী খান তাকে কঠোর হস্তে দমন করেন। এসময় রামজীবন ও তার দিউয়ান দয়ারামের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হন নবাব। স্বীকৃতিস্বরূপ ১৭১৪ খ্রিস্টাব্দে নবাব ভূষণা পরগনার ইব্রাহিমপুরসহ সমগ্র ভূষণা রামজীবনের জমিদারির অধীন্যস্ত করেন।

এরপর ১৭১৮ খ্রিষ্টাব্দে টাকি সরুবপুরের জমিদার বিদ্রোহ করলে মুর্শিদকুলী খান মুসলমান ও আফগান দলপতিদের কঠোর হস্তে দমন করেন। নবাবকে সহযোগিতার পুরুষ্কার হিসেবে টাকি সরুবপুরের জমিদারির বন্দোবস্ত দেয়া হয় রামজীবনের নামে। এভাবে একের পর এক জমিদারি সংযোজনের ফলে রাজশাহী জমিদারি বিশাল আকার ধারণ করে। বর্ধমানের পরেই বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারিতে পরিণত হয়। লোকমুখে প্রচারিত হয় যে, এ জমিদারির আয় ৫২ লক্ষ টাকা।

১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে রঘুনন্দনের মৃত্যু হয়। রঘুনন্দনের কোন উত্তরাধিকারী ছিল না। ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে রামজীবনও ইহলোক ত্যাগ করেন। রামজীবন অবশ্য মৃত্যুর বেশ পূর্বেই রামকান্তকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি জমিদারি রামকান্তের নামে উইল করে যান। এই রামাকান্তেরই স্ত্রী ছিলেন রাণী ভবানী।

রাণী ভবানীর জমিদারি লাভ: ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রাণী ভবানীর স্বামী রামকান্ত রাজশাহীর বিশাল জমিদারির লাভ করেন। কিন্তু তিনি জমিদারি পরিচালনায় ছিলেন একবারেই অনভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি ধর্মীয় কাজে লিপ্ত থাকতেন অধিকাংশ সময়। ফলে রাজকার্যে অবহেলা হতো। কিন্তু তার বিচক্ষণ স্ত্রী রাণী ভবানী এবং অভিজ্ঞ দিউয়ান দয়ারামের দক্ষতায় তার নামেই জমিদারি পরিচালনা করতে শুরু করেন। এরমধ্যে বিঘœ ঘটায় রামজীবনের ছোট ভাই বিষ্ণুরামের পুত্র দেবীরাম। তার চক্রান্তের জন্য রামকান্ত কিছু দিনের জন্য জমিদারিচ্যুত হন। কিন্তু বিশ্বস্ত দিউয়ান দয়ারামের চেষ্টায় অবশেষে নবাব আলীবর্দী খানের দপ্তর থেকে রামকান্তের নামে পুনরায় জমিদারি প্রত্যার্পণ ডিক্রী জারি হয়। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে রামকান্তের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পূর্বে তিনি রাণী ভবানীকে দত্তকপুত্র গ্রহণের অনুমতি দিয়ে যান।

১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে রাণী ভবানী রাজশাহী জমিদারির সমুদয় কর্তৃত্বের অধিকারী হন। তিনিই ছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা জমিদার। তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিমতি, মেধাবী, বিচক্ষণ ও অত্যন্ত সাহসী মহিলা। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি চার দশক জমিদারি পরিচালনা করেন।

বিশাল জমিদাররির মালিক হয়েও ব্যক্তিগতভাবে অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন রাণী ভবাণী। তিনি নিজে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করতেন। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তার উদারতা এবং সমাজহিতৈষী মনোভাব তাকে সাধারণ জনগনের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলে। তিনি ছিলেন দানশীল। তিনি বাংলায় শত শত মন্দির, চিকিৎসালয় ও অতিথিশালা (সরাইখানা) করেন। তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রাস্তা নির্মাণ করেন। তিনি প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট দূর করার জন্য অনেক বড় বড় দীঘি ও পুকুর খনন করেন। গ্রামে দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা ও পশু-পাখিদের পরিচর্যার জন্যও তিনি মুক্ত হস্তে দান করেন।

১৭৫৩ সালে তিনি ভারতের বেনারসে একটি শিবমন্দির স্থাপন  করেন। তিনি কাশীতে অর্থাৎ বেনারসে ভবানীশ্বর শিব ও দুর্গাবাড়ী, দুর্গাকুন্ড, কুরুক্ষেত্রতলা নামক জলাশয় খনন করেন। বাংলার তীর্থ যাত্রীদের অসুবিধা দূর করতে তিনি হাওড়া থেকে কাশী পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন, যা রানী ভবানী রোড ও পরবর্তি বেনারস রোড নামে বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে এটি বোম্বে রোডের অংশ। এছাড়া মুর্শিদাবাদ জেলায়ও ভাগীরথী নদী তীরবর্তী বড়নগরে তার নির্মিত ১০০ টি শিবমন্দির ছিল। কালের প্রবাহে অল্প কয়েকটি মন্দির টিকে আছে। মন্দিরগাত্রের টেরাকোটা শৈলী আজও দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করে।

এছাড়া বগুড়া জেলার শেরপুরে অবস্থিত তীর্থস্থান ভবানীপুরের মন্দিরসমূহের উন্নয়নে রাণী ভবাণী অনেক অবদান রাখেন। রাণী ভবানী নাটোর হতে বগুড়ার ভাওয়ানিপুর পর্যন্ত ‘রাণী ভবানীর জাঙ্গাল’ নামে একটি সড়ক নির্মাণ করেন। এসব কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তার প্রজারা তাকে ‘মহারাণী’ নামে আখ্যায়িত করে।

দিল্লীর কাছ থেকে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজস্ব আদায়ের দিউয়ানি লাভের পর প্রতক্ষ করে যে, রাজশাহী জমিদারি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ব্রিটিশ সার্ভেয়ার ও রাজ গবেষক হলওয়েল (১৭১১-১৭৯৮) রাজশাহী রাজ সম্পর্কে দেন যে, রাণী ভবানী বাংলার নবাবের কোষাগারে বার্ষিক প্রায় ৭০ লক্ষ সিক্কা রূপি রাজস্ব হিসেবে জমা দিতেন। যেখানে প্রকৃত রাজস্ব ছিল প্রায় দেড় কোটি সিক্কা রূপি। ব্রিটিশ গবেষক ও সার্ভেয়ার ও’ম্যালি (ঙ’গধষষব) রাজশাহী গেজেটে উল্লেখ করেন যে, রাণী প্রায় ৩৮০ টি প্রার্থনালয়, অতিথিশালা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির নির্মাণ করেছেন। তিনি এসকল জনকল্যাণকর এবং ধর্মীয়কাজের জন্য ভূমি ও অর্থ প্রদান করতেন। তিনি জমিদারির বিশাল অংশ ব্রাক্ষ্মণদেরকে লাখেরাজ সম্পত্তি হিসেবে দান করেছেন। তাই নানা দিক বিবেচনা করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাণী ভবানীকে তার জমিদারিতে বহাল রাখে। বিনিময়ে বৃটিশ আমলে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বাস্ততায়নে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের আমিনি কমিশনের রিপোর্টে রাজশাহী জমিদারির এক বিরাট আয় ব্রাক্ষ্মণদের সেবার জন্য ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তি হিসেবে পাওয়া যায়।

১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে রাণী ভবানী চল্লিশ বছর বয়স্ক দত্তকপুত্র রামকৃষ্ণর কাছে জমিদারি হস্তান্তর করে তিনি মুর্শিদাবাদ চলে আসেন ও বড়নগরে কন্যাসহ বাস করতে থাকেন।

এদিকে ব্রিটিশরা বাংলার শাসনভার কুক্ষিগত করার পর লক্ষ্য করে, সুবাহ বাংলার অর্ধেক ভূমি ও রাজস্বের মালিক রাজশাহী রাজের এবং বাংলার ভূ-সম্পত্তি রাজস্বের বাকি অর্ধাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র ১২টি মুসলিম জমিদার পরিবার (বার ভুঁইয়া) । ব্রিটিশ শাসকরা বড় জমিদারকে নিজের অস্তিত্বের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করল। কাজেই ওই সকল বড় জমিদারিকে ধ্বংস বা দুর্বল করে ফেলার উদ্দেশ্যে তারা প্রথমে রাজস্ব আদায়ের এক কৌশল হিসাবে সূর্যাস্ত আইন করল। যার পরিণতিতে প্রথম ধাক্কাতেই মুসলমান জমিদার বা বারো ভুইয়ারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

পরবর্তীতে ওয়ারেন হেস্টিংস রাজশাহী জমিদারি ধ্বংসের জন্য রাণী ভবানীর ছেলে রামকৃষ্ণের সাথে অস্বাভাবিকভাবে রাজস্ব বৃদ্ধি করে দশসালা চুক্তি করে। এটা ছিল জমিদারি কেড়ে নেয়ার একটি কৌশল। রাজশাহীর জমিদার ক্রমেই রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হতে থাকেন এবং একসময় তিনি নাটোরের ক্ষুদ্র জমিদারে পরিণত হন।

রাণী ভবানীর পৈত্রিক পরিচয়: রাণী ভবাণী (১৭১৬ – ১৭৯৫) বগুড়া জেলার তৎকালীন আদমদিঘী থানাধীন ছাতিয়ান নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আত্মারাম চৌধুরীও ছিলেন ছাতিয়ানার জমিদার। তার মাতা জয়দুর্গা। খুব অল্প বয়সেই তৎকালীন নাটোরের জমিদার রাজা রামকান্তের সাথে রানী ভবানীর বিয়ে হয়। তার তিন সন্তানদের মধ্যে ২ ছেলে শিশুকালেই মারা যায়। মেয়ে তারাসুন্দরী জীবিত ছিলেন।

মেয়ে তারাসুন্দরী জীবিত ছিলেন। তারা সুন্দরী শুধু নামে নয়, রূপে গুণে ছিলেন পরমা সুন্দরী। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, নিজের মেধা ও দক্ষতায় নবাব আলীবর্দী খানের দরবারে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।কথিত আছে,  নবাব সিরজ-উদ-দৌলা তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন, অক্ষয় কুমার  মৈত্র রচিত ‌‌’সিরাজদৌলা’ নাটকের ‘আলেয়ার’ চরিত্রটি ‌’তারা সুন্দরী’কে ঘিরেই রচিত। তবে এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। অবশ্য রানী ভবানীর একটি জীবনীও লিখেছিলেন অক্ষয় কুমার মৈত্র। কথা ছিল নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় এই গ্রন্থ প্রকাশ করবেন।  কিন্তু  মহারাজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে ‘রাণী ভবানী’ নামে এ গ্রন্থের কিছু অংশ ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে আর প্রকাশিত হয় নি। জনশ্রুতি আছে, অক্ষয়কুমার মৈত্রের শিক্ষক ও সাহিত্যগুরু হরিনাথ মজুমদার, যাঁকে আমরা কাঙাল হরিনাথ নামে চিনি, তিনি তাঁর ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় জমিদার ও নীলকরদের কৃষক নির্যাতনের কথা বিশদভাবে তুলে ধরতেন। তো ১৮৯৬ সালে হরিনাথ মজুমদার মারা গেলে অক্ষয়কুমার তাঁর সত্যনিষ্ঠা ও সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রবন্ধ লেখেন। এতে নীলকর ও জমিদাররা তাঁর ওপর রুষ্ট হন এবং তাদেরই অনুরোধে মহারাজা জগাদিন্দ্রনাথ ‘রাণী ভবানী’ ছেপে দেবার ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে ভারতের কলিকাতা থেকে এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটি সম্পাদনা করেছেন নিশীথরঞ্জন রায়। একসময় আমাদের অনেক ইতিহাস লেখকই জনশ্রুতির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করতেন। সম্ভবত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ই প্রথম ইতিহাস লেখক, যিনি এর ওপর ভিন্ন অবস্থান থেকে আলো ফেললেন, ইতিহাস লিখতে চাইলেন বিজ্ঞানসম্মতভাবে। ‘সিরাজদ্দৌলা’ ও ‘সীতারাম’ (১৮৯৮) ‘মীরকাসিম’ (১৯০৬) ‘ফিরিঙ্গি বণিক’ (১৯২২) সর্বশেষ ‘রাণী ভবানী’ (১৯৯০) তারই মূর্ত প্রকাশ।

জমিদারী রক্ষার জন্য রাণী ভবানী ছেলে হিসেবে রামকৃষ্ণকে দত্তক নেন। ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে চল্লিশ বছর বয়স্ক দত্তকপুত্র রামকৃষ্ণর কাছে জমিদারি হস্তান্তর করে রাণী ভবানী মুর্শিদাবাদ চলে আসেন ও বড়নগরে কন্যাসহ বাস করতে থাকেন। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদাবাদের বড়নগরে কন্যার বাড়িতে ৭৯ বৎসর বয়সে রাণী ভবানীর মৃত্যু হয়।

এরআগে নাটোরে ৪৯.১৯২৫ একর জমির ওপর নির্মিত রাজবাড়ীটি রাণী ভবানী দত্তক রামকৃষ্ণের দুই সন্তান বিশ্বনাথ (বড় তরফ) শিবনাথের (ছোট তরফ) বসবাসের সুবিধার জন্য দুইটি অংশে বিভক্ত করে দেন। রাজবাড়ির বর্তমান ধ্বংসাবশেষেও বড় তরফ ও ছোট তরফ বিদ্যমান রয়েছে। নাটোরের সেই রাজবাড়ী বাংলাদেশে একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে আজো রাণী ভবানীর স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তথ্য সূত্র: বাংলায় মুগল শাসন, জমিদারির ইতিহাস, রাজশাহীর জমিদার, নাটোরের জমিদার, বাংলা পিডিয়া, উইকিপিডিয়া। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ছবিটি নাটাের ডট নেট-এর সৌজন‌্যে

লেখক: সমাজ ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানের গবেষক ও রূপশ্রী সম্পাদক।

রূপশ্রী/এএসআর