বিএনপির ৩৬ নারী এমপির মধ্যে দায়িত্ব বন্টন, কে পেলেন কোন আসনের দায়িত্ব

6
ছবি: সংগৃহিত

রূপশ্র প্রতিবেদন

ঢাকা (সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬): ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির ৩৬ নারী এমপির মধ্যে দায়িত্ব  বন্টন করে দেওয়া হয়েছে।  তারা বিরোধী দলের ৭৯টি আসনে ‍সরকারের উন্নয়ন তদারকি এবং বিএনপির রাজনৈতিক  কর্মসূচি সমন্বয়ের দায়িত্ব দায়িত্ব পেয়েছেন।

সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় দলটির ৩৬ নারী এমপিদের মধ্যে এ দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়।  বিকেল ৩টায় সভা শুরু হয়। শেষ হয় সন্ধ্যা সোয়া ৬টায়। সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভা পরিচালনা করেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, দলের ৩৬ নারী এমপিকে বিরোধী দলের ৭৯টি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, সভায় কোনো নারী এমপিকে একটি আসনের দায়িত্ব, কাউকে দুটি এবং কয়েকজনকে সর্বোচ্চ চারটি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজনকে  দেওয়া হয়েছে পুরো জেলার দায়িত্ব। সে সব জেলায় এমপি রয়েছেন জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস ও এনসিপির নেতারা। এছাড়া বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জিতে আসা স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানার আসনেও সরকারি কাজ ও দলীয় তদারকির দায়িত্ব পেয়েছেন একজন সরকারদলীয় নারী এমপি। তবে বাকি ছয় স্বতন্ত্র এমপি; যারা বিএনপির সঙ্গে রয়েছেন বলে মনে করা হয়, তাদের আসনের দায়িত্ব কাউকে দেওয়া হয়নি। তবে বিরোধী জোটের ১৩ নারী এমপির মধ্যে এ রকম কোনো দায়িত্ব বন্টনের খবর পাওয়া যায়নি।
সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেন জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন এমপি, এনসিপির ৬ জন এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২ জন এমপি, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের একজন করে এমপি।

কোন আসনে কে দায়িত্বে
ঢাকা-১২, ১৫ ও ১৬ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির নারী এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে। তিনটি আসনই জামায়াতের। এর মধ্য ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ঢাকা-১২ আসনের এমপি জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। ঢাকা-১৬ আসনে দলটির এমপি হলেন কর্নেল (অব.) আবদুল বাতেন।  ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শাম্মী আক্তারকে। পাশাপাশি তিনি সিলেট-৫ আসনের দায়িত্বও পালন করবেন। এই আসনের এমপি খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নাদিয়া পাঠান পাপনকে। রুমিন বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয়ী হন।

পাবনা-১, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে আরিফা সুলতানা রুমাকে। সাতক্ষীরা-১, ২, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বীথিকা বিনতে হোসাইনকে। তাঁর বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি লক্ষীপুর-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর আসনে সেলিনা সুলতানা জুঁইকে, আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের এমপি সেলিমা রহমানকে বরগুনা-১ ও পটুয়াখালী-৩ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বরগুনা-১ আসনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সংসদ সদস্য মুফতি মাহমুদুল হাসান ওয়ালিউল্লাহ এবং পটুয়াখালী-৩ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ রয়েছেন।

জামায়াতের এমপি থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, ২ ও ৩ আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সানজিদা ইয়াসমিন তুলিকে। তিনি গুমের শিকার পরিবারের সংগঠন মায়ের ডাকের উদ্যোক্তা।

সেলিনা সুলতানা নিশিতাকে দেওয়া হয়েছে গাজীপুর-৪ ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের দায়িত্ব। ময়মনসিংহ ২ ও ৪ আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নিলোফার চৌধুরী মনিকে। শওকত আরা ঊর্মিকে মেহেরপুর-১ ও ২ আসনে, মাহমুদা হাবিবাকে রাজশাহী-১ ও ৪ আসনে, রাশেদা বেগম হীরাকে কুমিল্লা–৪ ও ১১ আসনে, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদকে যশোর-১, ২, ৪ ও ৫ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানাকে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নিপুণ রায় চৌধুরীকে নড়াইল ও মাগুরা জেলায়, জেবা আমিন ও ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাকে রংপুর জেলার ছয়টি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেওয়াজ হালিমা আরলিকে চুয়াডাঙ্গা, ফরিদা ইয়াসমীনকে কুষ্টিয়া-৩ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রেহেনা আক্তারকে নীলফামারী, ফাহমিদা হককে খুলনায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সভায় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাজেট প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেন, বাজেট হবে জনবান্ধন ও ব্যবসাবান্ধব। বাজেটে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আশ্বস্ত হবে। মানুষের ওপর নতুন করে কোনো দুর্ভোগ তৈরি করা হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেটে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিবেচনায় রাখা হবে।

বিরোধীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া: সরকারের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামাতে ইসলামী ও এসনিসিপি। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমে বলেন, বিএনপি প্রমাণ করল তারাও শেখ হাসিনার পথে হাঁটছে, ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি করতে চাইছে। এজন্য তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নবম সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি এবং বিজেপির ৩৪টি আসনে ‘উন্নয়নের’ দায়িত্ব দিয়েছিলেন সংরক্ষিত আসনের আওয়ামী লীগের নারী এমপিদের। ২০০৯ সালে গঠিত নবম সংসদে কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের এমপি ছিলেন হামিদুর রহমান। ওই আসনে শেখ হাসিনা প্রথমে দায়িত্ব দেন সংরক্ষিত আসনের এমপি গায়িকা মমতাজ বেগমকে। পরে দায়িত্ব দেন মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পিনু খানকে। এ তথ্য জানিয়ে হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী দলের এমপি যাতে কোনো কাজ করতে না পারেন। একজন এমপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাঁর আসনে সংরিক্ষত আসনের নারী এমপিকে চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, নির্বাচিত এমপিকে কাজ করতে না দেওয়া। এটি অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী চিন্তা। অতীতে এর ফল ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও ভালো হবে না।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, বিরোধী দলকে সরকার সব জায়গায় দমন করছে, বিরোধীদের আসনের দায়িত্ব সরকারদলীয় নারী এমপিদের দেওয়া তারই ধারবাহিকতা। বিরোধীদলীয় এমপিরা কোনো উন্নয়ন কাজ করলেও প্রচার করবে বিএনপির নারী এমপিরা করেছেন।