দেশের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন আর নেই

বনানীতে দাফন সম্পন্ন

1001

রূপশ্রী ডেস্কঃ

১০ জুলাই, ঢাকাঃ

বাংলাদেশের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন আর নেই।

একাদশ জাতীয় সংসদের সংসদ-সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি জ্বর, অ্যালার্জিসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২৫ মিনিটে থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৭ বছর ৪ মাস ৯ দিন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি-র মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন । এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, সাহারা খাতুন ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন পরীক্ষিত নেতা । বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে তিনি গণতন্ত্রের বিকাশসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে অপরিসীম অবদান রেখেছেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিককে হারালো।

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি -এর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। স্পীকার সাহারা খাতুন এমপি-এর রুহের মাগফেরাত কামনা এবং তাঁর শোকে-সন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোকবার্তায় বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে সাহারা খাতুন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আজীবন কাজ করে গেছেন। দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন দক্ষ নারীনেত্রী এবং সৎ জননেতাকে হারালো। আমি হারালাম এক পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাকে।

এছাড়া, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি-এর মৃত্যুতে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার মোঃ ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি এবং চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী এমপি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

শুক্রবার মধ্যরাতে সাহারা খাতুনের মরদেহ ব্যাংকক থেকে ঢাকা এসে পৌঁছায়। ১১ই জুলাই, শনিবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। বনানীতে দাফনের আগে ঢাকায় তার দুটি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বনানী জামে মসজিদের সামনে ফুল দিয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয় ।

করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নামাজে জানাজা এবং দাফন কাজে অংশগ্রহণের নির্দেশনা থাকলেও প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে সাধারণ মানুষের ঢল নামে। বেলা ১১টার আগে বনানী জামে মসজিদের সামনে জাতীয় পতাকা ও আওয়ামী লীগের দলীয় পতাকায় আচ্ছাদিত অবস্থায় সাহারা খাতুনের মরদেহ রাখা হয়। সেখানে জানাজা শেষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার শিরিন শারমীন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকারের পক্ষে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর আওয়ামী লীগ, ঢাকার দুই সিটি মেয়র, ১৪ দল, জাসদ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ, জাতীয় শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয় সাহারা খাতুনের প্রতি।

প্রবীণ এই রাজনীতিকের নামাজে জানাজায় অংশ নেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ফজলে নূর তাপস, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ড. মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী প্রমুখ।

জ্বর, অ্যালার্জিসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে অসুস্থ অবস্থায় গত ২ জুন সাহারা খাতুন ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার অবস্থার অবনতি হলে গত ১৯ জুন সকালে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর অবস্থার উন্নতি হলে তাকে গত ২২ জুন দুপুরে আইসিইউ থেকে এইচডিইউতে (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট) স্থানান্তর করা হয়। পরে ২৬ জুন সকালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আবারও তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। অসুস্থ সাহারা খাতুনকে গত ৬ জুলাই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে থাইল্যান্ডে নেওয়া হয়। সেখানেই থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে তিনি মারা যান।

একাদশ জাতীয় সংসদে তিনি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

১৯৪৩ সালের ১ মার্চ ঢাকার কুর্মিটোলা গ্রামে  জন্ম গ্রহণ করা অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বাংলাদেশের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬৭ সালে ছাত্রজীবন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। একজন সফল রাজনৈতিক সংগঠকের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন।

তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, গাজীপুর আইনজীবী সমিতি ও ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য। তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য। এছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক মহিলা আইনজীবী সমিতি ও আন্তর্জাতিক মহিলা জোটের সদস্য। তিনি আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ওমেন্সের ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

রূপশ্রী/টিআর