ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, চলে গেলেন এন্ড্রু কিশোর

1005

তাইেয়্যবা মারজান

‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে/রইবো না আর বেশিদিন তোদের মাঝারে’ সত্যিই দয়ালের ডাকে এবার এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে দেশে চলে গেলেন দরাজ গলার জনপ্রিয় শিল্পী এন্ড্রু কিশোর। হৃদয় উদাস করা এমন দরাজ  কণ্ঠের মুগ্ধ করা সুর আর গায়কি নিয়ে ৬ জুলাই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নেন তিনি। দীর্ঘ ১০ মাস ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরে গেছেন এই সুর সাধক। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। বিদেশে অবস্থানরত তার ছেলে-মেয়ে দেশে ফিরলে আগামী ১৫ জুলাই খৃষ্টান ধর্মমতে তাকে সমাহিত করা হবে।

আট বার জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত বাংলাদেশের এই কিংবদন্তী শিল্পীর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকর ফজলে রাব্বি মিয়াসহ দেশের শীর্ষ স্থানীয় রাজনীতিবিদ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংঠনের নেতৃবৃন্দ। ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে সঙ্গীত জগতের এই মুকুটহীন সম্রাটের মৃত্যুতে দেশ-বিদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে।

‘পরেনা চোখের পলক/কী তোমর রূপের ঝলক’, সবাই তো ভালোবাসা চায়/কেউ পায় কেউ বা হারায়’, ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘আমার বুকের মধ্যখানে মন যেখানে হৃদয় সেখানে’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো/আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিয়ো’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা’, ‘তুমি মোর জীবনে ভাবনা’, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না আমায় কথা দিয়াছে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান’, ‘আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি/ ওওওও/ এই চোখ দু’টি মোর খেয়ো না/ আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ মিটবে না গো মিটবে না’ সহ পনেরা হাজারেরও বেশি সিনেমার গান করেছেন তিনি। এ জন্য তাকে ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ বলা হয়ে থাকে।

http://youtube.com-yYmEMV6E

‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস/দম ফুরাইলে ঠুস’ গানের জন্য তিনি জীবনের প্রথম জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। ‘কী ‘কী জাদু করিলা/পিরিতি শিখাইলা’ গানটির জন্য ২০০৮ সালে জীবনের শেষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এন্ড্রু কিশোর। প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে তিনি সঙ্গীত জীবন শুরু করেছিলেন ১৯৭৭ সালে ‘মেইল ট্রেন’ সিনেমার মধ্য দিয়ে, এরপর আর পিছনে পিরে তাকাতে হয়নি কখনো।

বাংলাদেশের এই কিংবদন্তী সংগীতশিল্পী মৃত্যুর সময় রাজশাহী মহানগরের মহিষবাথান এলাকায় বোন ডা. শিখা বিশ্বাসের বাসায় ছিলেন। তার ওই বাড়িটির একটি অংশেই রয়েছে ক্লিনিক। সেখানেই চিকিৎসা চলছিল এন্ড্রু কিশোরের। প্রায় ৯ মাস পর সিঙ্গাপুর থেকে গত ১১ জুন দেশে ফেরেন তিনি। গত বছরের ৯ সেপ্টেস্বর শরীরের নানা জটিলতা নিয়ে সিঙ্গাপুর চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন তিনি। ছয়টি ধাপে তাকে মোট ২৪টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। এর আগে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে দেশে ফেরা হয়নি তার।

দেশে ফিরে শেষ সময়টা কোলাহলমুক্ত কাটাতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই নিজ জন্মভূমি রাজশাহীতে চলে যান। ২০ জুন থেকে তিনি রাজশাহীতেই ছিলেন। তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। তাই দেশে ফেরার খবরটি এতদিন কাউকে জানাননি। এ প্রসঙ্গে এন্ড্রু কিশোর নিজের ফেসবুক টাইম লাইনে লিখেছিলেন, ‘কয়েক দিন হলো দেশে এসেছি। কিছুটা সময় একান্তে থাকতে চেয়েছি। তাই পরিবারের বাইরে কাউকে জানাইনি। তাছাড়া শরীরের অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। ডাক্তার কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, কোলাহলমুক্ত থাকতে হবে- সেই নির্দেশনা মেনেই চলছি।’

তবে গতকাল রবিববার (০৫ জুলাই) থেকে এন্ড্রু কিশোরের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাই ফেসবুকের এক পোস্টের মাধ্যমে শিল্পীর সুস্থতায় প্রাণ খুলে দোয়া করার জন্য সবার কাছে অনুরোধ করেছিলেন স্ত্রী লিপিকা। সোমবার (০৬ জুলাই) দুপুরে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি ঘটায় বাড়িতে রেখেই তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়। কিন্তু ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধে আর টিকে থাকতে পারেননি বাংলা গানের এই কিংবদন্তী শিল্পী।

এন্ড্রু কিশোরের শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসার জন্য তাকে  ১০ লাখ টাকা সহায়তা করেছিলেন। ‘গো ফান্ড মি’ নামে এক ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও তার চিকিৎসা তহবিল সংগ্রহ করা হয়। সহশিল্পীদের মধ্যেও অনেকে এসময় শিল্পীর সহায়তায় তার পাশে দাঁড়ান। কিন্তু চিকিৎসায় তার সুস্থতা আসেনি।

অমর নায়ক সালমান শাহের ছবির জন্য ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখো’ গান গেয়ে যাওয়া এই কিংবদন্তি আকাশে নিশ্চয়ই ভালো থাকবেন। ভক্তদের প্রার্থনা এই।

#

রূপশ্রী/টিএম