রূপশ্রী প্রতিবেদন, শনিবার (২৬ জুন), ঢাকা: দেশের বিকাশমান ই-কমার্স বাণিজ্যের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলেও এখন সমালোচনার কেন্দ্রে ।অনলাইনভিত্তিক বিভিন্নবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ দিনদিন বাড়ছে। প্রতারণার এসব অভিযোগ তদন্তে নেমে পাওয়া যায় প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির সম্পদের চেয়ে ছয়গুণ বেশি দেনা, যা পরিশোধের সক্ষমতা নেই কোম্পানিটির। এরপর নড়েচড়ে বসে বেশকিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ই-কমার্সের প্রতারণা ঠেকাতে লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষেয় গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা বিষয়ে অনুিষ্ঠত এ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বিভাগ, ডাক ও টেলিযােগাযোগ বিভাগ, তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ, বিটিআরসি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ ই-ক্যাব নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এরআগে ইভ্যালি, আলিশামার্টসহ ১০টি ই-কমার্স সাইট থেকে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ড দিয়ে কেনাকাটা স্থগিত করে ব্র্যাক ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ও ব্যাংক এশিয়া। এছাড়া ইউসিবি, সিটি ব্যাংক এবং লংকাবাংলা ফাইন্যান্স এসব প্রতিষ্ঠানের কার্ড ব্যবহার করে লেনদেনের বিষয়ে গ্রাহকদের সতর্ক করে দেয় । যার অর্থ পণ্য কেনার পর প্রতারিত হলে এসব প্রতিষ্ঠান দায়-দায়িত্ব নেবে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লোভনীয় নানা রকম অফার দিয়ে গ্রাহকের কাছে পণ্য সরবরাহের আগেই অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অর্থ নিচ্ছে এবং তা নিয়ে মানুষের হয়রানির অভিযোগ এসেছে।
সেজন্য কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পণ্য গ্রাহকের হাতে পৌঁছানোর পরই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অর্থ পাবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা নিয়ন্ত্রণ করবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে ক্রেতাদের কাছে পণ্য ডেলিভারির পরই টাকা পাবে। সব লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বললে বাস্তবতার নিরিখে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও তাদের লেনদেন যাচাই-বাচাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সম্প্রতি এসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শন টিম। যাচাই-বাছাই করে ওই টিম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির চলতি সম্পদের পরিমাণ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির দেনার পরিমাণ ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সম্পদের চেয়ে ছয়গুণের বেশি দেনা পরিশোধের সক্ষমতা নেই ইভ্যালির।
সরকারি এ সিদ্ধান্তের পর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, সরকারি এই সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিয়ে এখন সেভাবে তারা তাদের নীতিমালা তৈরি করবে। তবে বিষয়টি আর বাংলাদেশের সীমান্তে আটকে নেই।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ই-ভ্যালি
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসি এ বিষয়ে একাধক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছ, বৈঠকের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেছেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর পেমেন্ট পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন।
তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হবে যে পণ্য ডেলিভারির পর গেটওয়েরা যখন তথ্য পাবে, এটা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা পেমেন্টটা ই-কমার্স কোম্পানির জন্য রিলিজ করবে।
পণ্য ডেলিভারির আগ পর্যন্ত তারা পেমেন্টটা হোল্ড করে রাখবে, বলেন মি. রহমান।
তিনি আরও জানিয়েছেন, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডে লেনদেনের গেটওয়ে আছে, এর মাধ্যমে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সাথে গ্রাহকের লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করবে।
লেন-দেন বন্ধের কারণ কী?
এমন সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মি. রহমান বলেছেন, সমস্যা হচ্ছে যে, কিছু ই-কমার্স কোম্পানি ভোক্তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যথাসময়ে পণ্য দিচ্ছে না। এবং কিছু কোম্পানির হাতে অনেক ভোক্তার টাকা জমা হয়ে গেছে।
“কিছু মার্চেন্ট যারা পণ্য সরবরাহ করে, তাদেরও টাকা জমা হয়ে আছে। এসব কোম্পানির কাছে। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইভ্যালি একটা। এর সাথে আরও কোম্পানি আছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেই কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে” বলে উল্লেখ করেন মি. রহমান।
তবে ইভ্যালিসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পণ্য সরবরাহ করার তিনমাস আগে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছে।
এই অর্থ নেয়ার ক্ষেত্রে অর্ধেক দামে বা কম দামে পণ্য দেয়ার নানা রকম লোভনীয় অফার দেয়া হচ্ছে। এটাই এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার অন্যতম ভিত্তি বলা হয়।
কিন্তু এই পদ্ধতিতে মানুষের হয়রানির নানা অভিযোগের তুলে ধরে সরকারি কর্তৃপক্ষ এখন বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছে।
ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
ইভ্যালির কর্ণধার মোহাম্মদ রাসেল অবশ্য বলেছেন, পেমেন্ট নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এখন তাদের ব্যবসার ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে।
“কাস্টোমারের পেমেন্ট সিস্টেমে একটু পরিবর্তন আনবে। আমরাও এটাকে স্বাগত জানাই। নীতিনির্ধারকরা যে নিয়মকানুন করবেন, আমরাও চাই না তার বাইরে যেতে।”
তিনি আরও বলেন, “আগে পেমেন্ট করলে আমরা তা পেয়ে যেতাম। পণ্য সরবরাহকারির সাথে সেভাবেই ব্যবস্থা ছিল।
”এখন সরবরাহকারিকে যদি আমরা কনভিন্স করতে পারি যে আমাদের পেমেন্ট হোল্ড আছে এবং এখন আপনারা প্রোডাক্টটা দেন।”
একইসাথে মোহাম্মদ রাসেল মনে করেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রাথমিক।
“ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার বিষয় নিয়ে এবং এই ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হয়তো আমাদের সাথে আলোচনা করবে।
#
এনএ/আরএইচ







