পবিত্র হজ পালিত

751

রূপশ্রী প্রতিবেদন

ঢাকা: আল্লাহর দয়া ও করুণা লাভের আশায় ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ বলতে বলতে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফার প্রান্তরে সমবেত হয়ে হাজিরা গতকাল পালন করছেন হজের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা। এসময় সমবেত হাজিরা শুনেছেন খুৎবা এবং দোয়া ও মোনাজতে অংশ নিয়ে করোনা মহামারি থেকে মুক্তি ও গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে তাঁর দয়া ও করুণা ভিক্ষা করেন।

গতকাল মিনা থেকে  আরাফায় পৌঁছে হাজিরা কাতর কন্ঠে ক্রমাগত বলতে থাকেন, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়া ন্নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।’ ‘হে আল্লাহ আমি হাজির! আমি উপস্থিত! আপনার কোন অংশীদার নেই। (এই সত্যের ঘোষণা দিতে) আমি হাজির। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা আপনার ও সম্পদরাজি আপনার এবং রাজত্বও একমাত্র আপনারই। আপনার কোন অংশীদার নেই।’

এভাবেই সৌদি আরবের দিনপঞ্জী অনুযায়ী প্রতিবছরের ন্যায় হিজরি মাসের ৯ জিলহজ তারিখে গতকাল বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ পালিত হয়। করোনা মহামারির কারণে আরাফার প্রান্তরে এবার ছিল না লাখো মানুষের ঢল। সীমিত পরিসরে কঠোর স্বাস্থ্য বিধি মেনে পালিত এবারের হজে ছিল না উপচে পড়া ভিড়। এবার হজ করার অনুমোদন পায়নি কোন বিদেশি হাজি। তবে সৌদি প্রাবাসি বিদেশিসহ মাত্র একহাজার এবার হাজির হন আরাফর প্রান্তরে। সেখানে তারা হজের খুৎবা শোনেন। এবার খুৎবা দেন সৌদি রয়্যাল কোর্টের সিনিয়র স্কলার্স কাউন্সিলের সদস শেখ আদুল্লাহ বিন সুলিমান আল-ম্যানিয়া। আরাফাতের এই খুতবা বাংলাসহ ১০টি ভাষায় বিভিন্ন দেশের টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। খুৎবার পর হাজিরা জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন এবং দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে বিশে^ চলমান করোনা মহামারি থেকে মুক্তি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং গুনাহ মাফের রোনাজারীর মাধ্যমে তাঁর দয়া ও করুণা ভিক্ষা করেন। এভাবেই এবারও পালিত হলো পবিত্র হজ। এরপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফর প্রান্তরে অবস্থান করেন। এসময় হাজিদের মসজিদে নামিরায় বসে কোরআন তিলাওয়াত ও নফল নামাজ আদায় করতে দেখা যায়। এসময় হাজিদের পরস্পর থেকে দেড় মিটার দূরে দূরে নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করতে দেখা যায়। এবার হজ করছেন মাত্র ১ হাজার হাজি হজে অংশ নেওয়ায় এবং কঠোর স্বাস্থ্যবিধির কারণে এবার কাউকে আরাফার খোলা ময়দান বা পাহাড়ে বসে কাঁদতে দেখা যায়নি।

খুৎবায় আল-ম্যানিয়া করোনা মহামারি সম্পর্কে আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.) এর বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, ‘নবীজী বলেছিলেন, আল্লাহর বান্দারা, অসুস্থতার নিরাময়ের সন্ধান করুন, যেহেতু পৃথিবীতে এমন কোন রোগ নেই যার নিরাময় নেই।’ আবার নবী এটাও বলেছিলেন: ‘কুষ্ঠরোগী থেকে পালিয়ে যাও, যেহেতু আপনি সিংহ থেকে পালিয়ে যাবেন’, পাশাপাশি ‘যিনি সুস্থ আছেন তাকে অসুস্থ অবস্থায় রাখবেন না।’ তিনি আরও বলেন, এই পৃথিবীর মানুষের জন্য এটি একটি পরীক্ষা। এরমাধ্যমে তিনি তার বান্দাদের মধ্যে আমলের ভিত্তিতে পৃথক করে দেন। তবে এই পরিস্থিতি যতই কঠিন হয়ে উঠুক না কেন, সমস্যা কখনো চিরস্থায়ী হয় না। আল্লাহর রহমত সর্বদা আরও বিস্তৃত। তাঁর করুণা দান সর্বদা তাঁর বান্দার সবচেয়ে নিকটে থাকে।

সামাজিক দুরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বলেন, মহামারী যে ক্ষতির করতে পারে তার বিরুদ্ধে জীবন রক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। আল্লাহর মানুষের জীবন রক্ষার যে অনুমোদন দিয়েছেন ইসলামের শিক্ষার আলোকে তা বাস্তবে রূপ দেয়া হয়েছে ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে এবার ধর্মীয় অনুশাসন রক্ষায় সীমিত আকরে পালিত হয় এই হজ। এজন্য এবার সামাজিক দুরত্ব মেনে ও মাস্ক পড়ে আল্লাহর ঘরের তাওয়াফকারীরা পবিত্র কাবা ঘর তাওয়াফ করেছেন। রাষ্ট্রীয় বিধি নিষেধের কারণে হাজিদের এবার কাবাঘরের কাছেও যেতে দেওয়া হয়নি। এমনকি পাপমুক্তির জন্য পবিত্র ‘হাজরে আসওয়াদ’ পাথরে চুমু খেতেও পারেননি হাজিরা। হজের কার্যক্রম শুরুর আগেই খাদেমুল হারমাইন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা কালো পাথরের মুখ আবরণ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়।

হজের বিধি মোতাবেক গতরাতেই হাজিরা আরাফাতের ময়দান থেকে মুজদালিফা যান এবং সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন। সাধারণত হাজিদেরকে মুজদালিফায় অবস্থানকালে শয়তানকে ছুড়ে মারার জন্য রাতের বেলা কঙ্কর সংগ্রহ করতে হতো। এবার তা করতে হবে না। এবার আগে থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সংগৃহিত ও জীবাণুমুক্ত প্যাকেটজাত পাথর সরবরাহ করবেন। হাজিরা আজ জামারায় শয়তানকে সে পাথরই মারবেন।

আজ শুক্রবার ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে মিনায় ফিরবেন হাজিরা। মিনায় ফিরে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে হাজিরা জামারায় পাথর নিক্ষেপের জন্য রওনা দেবেন। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে যাওয়ার আগেই জামারাতুল আকাবায় (বড় শয়তান) সাতটি পাথর নিক্ষেপ করবেন। পাথর নিক্ষেপের পর আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তারা পশু কোরবানি করবেন। এরপর মাথা মুন্ডন করবেন। এ ছাড়া প্রথম দিনের কঙ্কর মারা শেষ হলে চলমান হজ কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব হাজীকে মিনায় নির্দিষ্ট তাঁবুতে আবস্থান করতে হবে। মিনায় দুই দিন অর্থাৎ ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে হাজিদের একইভাবে প্রতিদিন শয়তানের উদ্দেশে কঙ্কর মারতে হবে। সেখানে ছোট জামারা, মধ্য জামারা ও বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে হাজিরা মিনা ত্যাগ করবেন।

এরপর মক্কায় ফিরে হাজিরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সায়ী করবেন বা দৌড়াবেন। তারপর বিদায়ী তাওয়াফ করবেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের তাওয়াফের জন্য কাবাঘরের চারপাশ এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ানোর স্থানকে প্রতি দল হাজির ব্যবহারের আগে ও পরে জীবাণুমুক্ত করার ববস্থা করেছে। তারপরও বাড়তি সতর্কতা হিসেবে কাবাঘরে নামাজ আদায়ের জন্য নিজস্ব জায়নামাজ আনার বাধ্যবাদকতা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া কোন হাজি যাতে পবিত্র কাবাঘর ও কালো পাথরের কাছে যেতে না পারেন সে জন্য এর চারপাশে কৃত্রিম দেয়াল তুলে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। জমজমের কূপ এলাকায়ও হাজিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তবে বোতলে করে হাজিদের জমজমের পানি সরবরাহ করা হয়। সর্বোপরি হজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রত্যেক হাজিকে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগেও হাজিদের সাতদিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। এ বছর সীমিত পরিসরে হজ পালনের জন্য এসব বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি জারি করে সৌদি আরবের জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

রূপশ্রী/এইচ/ধর্ম/ইসলাম/হজ