পবিত্র আশুরা ও শুহুদে কারবালা দিবস আজ

324

রূপশ্রী প্রতিবেদন, ঢাকা:
“নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া/আম্মাগো পানি দাও, ফেটে গেল ছাতি মা/ কাঁদে কোন ক্রন্দসি কারবালা ফোরাতে/ সে কাঁদনে আসু আনে সিমারের ছোড়াতে”/

‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না’—
ফিরে এলো আজ সেই মহরম মাহিনা…।

আজ ১০ মুহররম, পবিত্র আশুরা ও শুহুদে কারবালা দিবস।
পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশুরার তাৎপর্য তুলে ধরে পৃথক বাণী দিয়েছেন। এ উপলক্ষে আজ বুধবার সরকারি ছুটি।

কারবালা প্রান্তরে হজরত ইমাম হুসাইন রা এর মাজারের ছবি

প্রায় চৌদ্দশ’ বছর আগে ৬১ হিজরির ১০ই মুহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে আল্লহর প্রিয় হাবিব নবী ও রাসূল, বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স.)’র প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর স্ত্রী পুত্র কন্যা ও আত্মীয় পরিজনসহ ৭২ জন সফর সঙ্গী ইসলামের সত্য ও ন্যায় বিসর্জন দিতে অস্বীকার করে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। নিজেদের জীবন বাঁচাতে তাঁরা ইসলামের শরিয়তের মাপকাঠিতে অযোগ্য ব্যভিচারী ও মদ্যপ এজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার হাতে বাইয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। জীবন বাঁচাতে বাতিল ও অন্যায়ের সাথে আপোষ না করে সেদিন ইমাম হোসেন (রা.) পাপিষ্ঠ এজিদ বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। এ কারণে ১০ মহররম বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বেদনাবিধুর দিন। এছাড়া ইতিহাসের এদিনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নীলনদ বিভক্ত করে ফেরাউনের কবল থেকে ইসলামের অন্যতম নবী হজরত মূসা (আ.) কে তাঁর অনুসারীদের রক্ষা করেছিলেন।
পবিত্র আশুরা তাই এক অসামান্য তাৎপর্যে উজ্জ্বল। মূসা আ. এর অনুসারীদের জন্য দিনটি নাজাত ও কৃতজ্ঞতার। সেদিন এক আল্লাহ ও তাঁর নবীর সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠিত ও ফেরাউনের মিথ্যা বিলীন হয়েছিল। তবে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য দিনটি চরম ইমানী পরীক্ষার। দিনটি হক ও বাতিলের লড়াইয়ে আমি কোন পক্ষে তা যাচাই করার দিন।

ইরাকের কারবালা প্রান্তর অভিমুখী শিয়া মুসলমানদের একটি কাফেলা

কারণ খালেস বুজুরগানে দ্বীন মনে করেন, ইমাম হুসাইন রা. সেদিন এজিদের হাতে আনুগত্যের শপথ নিলে আজ ঈমান, আকিদা, ইসলাম, আখলাক, শরিয়তের বিধান, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কোন ফারাকই অবশিষ্ট থাকতো না। শিশু সন্তানসহ স্বপরিবারে শাহাদাতের মাধ্যমে তিনি ইসলামকে জিন্দা রাখার শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
কবির ভাষায় “ ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালা কে বাদ”
তাই হুসেইন শহীদ কারবালার মর্মন্তুদ সকরুণ শোকগাথা এ দিবসকে গভীর কালো রেখায় উত্কীর্ণ করে রেখেছে। শিয়া মুসলমানরা দিনটিকে সেভাবেই পালন করেন। তারা দান খয়রাত ও সদকা করেন। গরীবের মধ্যে খাদ্য বিতরণ, শোক মিছিল, মাতম করে ও মার্সিয়া গেয়ে দিনটি পালন করেন।
সুন্নি মুসলমানরা দিনটি পবিত্র আশুরা হিসাবে ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে পালন করেন। আগে পরে মিলিয়ে আশুরা উপলক্ষে দুদিন রোজা পালন করেন। কার্যত দিনটি মুসলমানদের কাছে সত্য ও মিথ্যা বিলীন হওয়ারও দিন। এ দিনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে খুবই প্রিয়। তাই তিনি এ দিনে গুনাহ থেকে নাজাতের ফয়সালা দিয়ে থাকেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর প্রিয় মহরম মাসের রোজা এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের (তাহাজ্জুদ) নামাজ, (সহিহ মুসলিম)।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করলেন, তিনি আশুরার দিনে ইহুদিদের রোজা পালন করতে দেখলেন।
‘ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে দেখলেন যে, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোনোদিন যে তোমরা রোজা পালন করছো? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিবস যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। মুসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিনে রোজা পালন করেছেন। এ কারণে আমরাও রোজা পালন করে থাকি। এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের চেয়ে আমরা মুসা (আ.)-এর অধিকতর ঘনিষ্ঠ ও নিকটবর্তী। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা পালন করলেন ও অন্যদের রোজা পালনের নির্দেশ দিলেন। (বুখারি ও মুসলিম)।
আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশুরার রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো, তিনি বললেন, আমি আশা করি আল্লাহর কাছে এটি বান্দার বিগত এক বছরের গুনাহসমূহের কাফফারা হিসেবে গণ্য হবে (মুসলিম হা/১১৬২; মিশকাত হা/২০৪৪)।
পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসা ও খানকা শরীফে কারবালা মর্মান্তিক ঘটনার বয়ান, মিলাদ, দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষেরা ইবাদত বন্দেগি ও রোনজারির মাধ্যমে দিনটি পালন করবেন।

বাংলাদেশের শিয়া মুসলমানরা পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে পুরান ঢাকার হুসেনি দালান থেকে তাজিয়া মিছিল বের করবে।  উপলক্ষে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

পবিত্র আশুরা ১৪৪৬ হিজরি উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে বাদ জোহর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে “পবিত্র আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য” শীর্ষক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।