স্কুল খুলে কি ছেলেমেয়েদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব: প্রধানমন্ত্রী

679

রূপশ্রী প্রতিবেদন,

শনিবার (৩ জুলাই), ঢাকা:

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখবে। কিন্তু সেই লেখাপড়ার জন্য তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবো কিনা আমাদের মাননীয় বিরোধী দলের উপনেতা সেটা একটু বিবেচনা করবেন। একটা ছেলে মেয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবে, এটা তো করতে পারি না। ছোট্ট শিশুদেরও তো করোনা হচ্ছে। আমরা জেনে শুনে লেখাপড়ার জন্য মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব কিনা সেটাও একটু বিবেচনা করবেন।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

স্কুল খুলেদেবার দাবি প্রসঙ্গে বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, যাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজ ইউভার্সিটিতে যায় তারাই কিন্তু চান না তাদের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে। তবে ইদানিং সবচেয়ে বেশি সোচ্চার যাদের ছেলে মেয়ে পড়ে না তারা। পড়ার মতো ছেলে মেয়ে নাই, তারাই বেশি কথা বলে। কিন্তু যারা যায় তারা তো চাচ্ছেন না।

শেখ হাসিনা বলেন, টিকা দিয়ে আমরা কিন্তু সকল স্কুলগুলো খুলে দিব। কিন্তু আমরা যখন ঠিক সিদ্ধান্ত নিলাম খুলবো তখনই এই করোনাভাইরাস এমনভাবে মহামারী আকারে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পরলো আর তার ধাক্কাটা আসলো আমাদের দেশে। তিনি বলেন, হ্যাঁ স্কুল বন্ধ আছে। বাচ্চারা পড়ালেখা করবে- এটা আমরা চাই। স্কুল-কলেজ বন্ধ আছে। কিন্তু পড়ালেখা যাতে বন্ধ না হয় এজন্য এই সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্লাস চালানো হচ্ছে। এছাড়া আমরা রেডিও উন্মুক্ত করে দিয়েছি। রেডিওর মাধ্যমে যাচ্ছে, অনলাইনে যাচ্ছে। যে যেভাবে সুযোগ পাচ্ছেন পড়ালেখা করছেন। আমরা পড়াশোনার চালিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছি। তাতে আমরা বলব একটু ক্ষতি হচ্ছে। বিরোধী দলীয় উপনেতাকে উদ্দেশ্যকে সংসদনেতা বলেন, বলার জন্য বলবেন সেটা ঠিক আছে। কিন্তু এই ছেলেমেয়েগুলোকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবে কিনা? আমাদের অনেক পরিচিতজন বিদেশে পড়ালেখা করে। আমার নাতিরা পড়ালেখা করে। সেখানে অনলাইনে পড়ালেখা চলে। কিছু দিন স্কুল খুললো আবার যখন মহামারী ছড়িয়ে পড়লো তখন আবার বন্ধ। এটা শুধু বাংলাদেশ না। এটা সারাবিশ্ব একই অবস্থা। এটা সবাইকে মানতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই শিক্ষকদের টিকা দিয়েছি । কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী কোন টিকা কোন বয়সে দিতে হয় সেটা অনুসরণ করতে হয়। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ইতিমধ্যেই আমরা শিশুদের টিকাদান শুরু করেছি। এসময় তিনি আরো বলেন, শিক্ষার জন্য সবচাইতে বেশি কাজ কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারই করেছে।

গ্রামে যাওয়ার কারণে সংক্রমণ বৃদ্ধি
গ্রামে যাওয়ার কারণে সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়টি উল্রেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে গত ঈদুল ফিতরে বার বার অনুরোধ করলাম আপনারা আপনাদের জায়গা ছেড়ে যাবেন না, কিন্তু অনেকেই তো সে কথা শোনেন নাই। সকলেই ছুটে চলে গেছেন। আর তার ফলাফলটা কি হল? যারা বাইরে ছিল পুরো বর্ডার এলাকায় বিভিন্ন জেলায় এই করোনাটা ছড়িয়ে পড়ল। সকলে যদি আমাদের কথা শুনত তাহলে হয়তো আজকে এমনভাবে করোনা ছড়িয়ে পড়তো না। তারপরেও মানুষ আসলে যেতে চায় এটাই সমস্যা।

৮০ ভাগ লোককে টিকার আওতায় নিয়ে আসব
টিকা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের স্বার্থে তাদের কল্যাণে বিনা পয়সায় টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছি। টিকা আসতে শুরু হয়েছে কোন অসুবিধা হবে না। আমরা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছি ৮০ ভাগ লোককে টিকার আওতায় নিয়ে আসব। আর সমস্ত টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। আমরা অনেক টাকা দিয়ে টিকা কিনছি, প্রথমে যেটা দিয়েছি সেটা অল্প দামে ছিল, কিন্তু এখন অনেক দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তারপরেও জনগণের স্বার্থে তাদের কল্যাণে বিনা পয়সায় টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছি। যেহেতু বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে তাই করোনা পরীক্ষা বিনা পয়সায় শুরু করেছি।

মানুষের পাশে দাঁড়াতে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনকালে জনগণের পাশে থাকার বিষয়ে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেছি মানুষের পাশে দাঁড়াতে। শুধু সরকার না আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ এবং আমাদের সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে মানুষকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে প্রণোদনা দিয়েছি বিভিন্ন খাতে। আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি। এমন কোন শ্রেণি পেশার মানুষ নেই যাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়নি। যেহেতু আবার করোনা দেখা দিয়েছে আমাদের সাধ্যমত আবার সহায়তা দেব, কারো খাদ্য প্রাপ্তিতে যাতে অসুবিধা না হয় অবশ্যই সেই বিষয়টা আমরা দেখব।

প্রবাসীদের টিকায় অগ্রাধিকার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসী শ্রমিকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে টিকা দেয়ার বিষয়ে বলেন, যে সকল শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে তাদের টিকা প্রদানে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ফাইজারের টিকা যেটা এসেছে যারা বিদেশে শ্রমিক যাচ্ছে তাদের অগ্রাধিকার থাকবে এই টিকা পাওয়ার। যাতে তারা ভ্যাকসিন নিয়ে বিদেশে যেতে পারে। যাতে তাদের সেখানে গিয়ে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে না হয়। সেভাবেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। তিনি বলেন, গতকাল রাতে এবং আজ খুব ভোরে মর্ডানা এবং সিনোফার্মের টিকা বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। মর্ডানা থেকে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন চলে আসছে। সিনোফার্মের ২ মিলিয়ন এসেছে। সিনোফার্মের টিকা কিন্তু ক্রয় করেছি তার আগে চীন থেকে কিছু উপহার পাঠানো হয়েছে। ভারতও কিছু উপহার দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, টিকার একটু সমস্যা হয়েছিল ভারতে থেকে টিকা রফতানি বন্ধ করাতে। বর্তমানে টিকা এসে গেছে। আমরা চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া সব দেশের সাথে যোগাযোগ করছি। যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, নিয়ে নিচ্ছি। যেখানে যেখানে টিকা পাওয়া যাচ্ছে আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাদের সাথে যোগাযোগ করছি। আরও টিকা নিয়ে আসবো। যত লাগে টিকা কিনবো। তার জন্য বাজেটে আলাদা টাকা রাখা আছে, এজন্য কোন চিন্তা করতে হবে না। আমাদের নিজেদের বিমান পাঠিয়ে আমরা চীন থেকে সিনোফার্মের টিকা নিয়ে আসছি। আমেরিকা থেকে যেটা আসছে মর্ডানার সেটা তারা পাঠিয়েছে। বাজেটেও প্রচুর টাকা রেখেছি। ৩২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, আরও ১০ হাজার কোটি টাকা আলাদা রাখা আছে রিজার্ভে। আমাদের সব সময় লক্ষ্যই হচ্ছে দেশের জনগণের কল্যাণ করা।

কুরআন শরীফে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা অবশ্যই আছে
ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে বিএনপি এমপির দেওয়া বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য বলেছেন কুরআন শরীফে নাকি ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলা নেই। আমি বলব অবশ্যই আছে। আমাদের নবী করীম (সা.) বলেছেন অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল হতে। তিনি এই শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদের কুরআন শরীফে বলা হয়েছে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম সকল ধর্মের মর্যাদা দেয়। কোরআন শরীফে আছে ‘লাকুম দিনুকুম ওয়াল ইয়াদিন’ অর্থাৎ ‘যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে’। যার যার মতামত সে প্রকাশ করবে। এটা প্রকৃতপক্ষে ধর্ম নিরপেক্ষতাই আসে। যতই তিনি অস্বীকার করুন, যেভাবে তিনি ব্যাখ্যা দেন। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। যুগ যুগ ধরে এটা চলছে। হ্যাঁ, অবশ্যই নিজের ধর্ম পালনে সবসময় গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল থাকতে হবে। এটা আমাদের শিক্ষা। এটা নবী করিম (সা.) সবসময় বলে গেছেন। কাজেই এ ধরনের কথা সংসদে না বলাটাই ভালো।

এসটি/এইচআর