রূপশ্রী প্রতিবেদন
১৭ মার্চ, ঢাকাঃ
প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক উপ রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের ইন্তেকালে শোক প্রকাশ করেছেন দেশের রাজনীতিকরা। পৃথক পৃথক শোক বার্তায় তার মৃত্যুতে সমবেদনা জানান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও উপ-রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
মওদুদ আহমদের মৃত্যুতে বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ব্যারিস্টর মওদুদ আহামদের মৃত্যুতে আমি অত্যন্ত ব্যথিত এবং দুঃখিত হয়েছি।’
মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) বি. চৌধুরী গণমাধ্যমে দেওয়া শোকবাণীতে আরও বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। বেশিরভাগ সময় একপক্ষে রাজনীতি করেছি। তিনি জ্ঞানী মানুষ ছিলেন, অত্যন্ত শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা এবং দক্ষতা সত্যি সত্যিই খুব ইমপ্রেসিভ ছিল। সে জন্য তিনি আমার বয়সে ছোট হলেও প্রিয় মানুষ ছিলেন, বন্ধুবৎসল ছিলেন। সুন্দর সেন্স অফ হিউমার ছিল। রাজনীতির জন্য তিনি এলাকার মানুষের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। যারাই রাজনীতি করতেন তাদের সঙ্গে তার সখ্য এবং বন্ধুত্ব ছিল। তার এই রাজনীতির প্রজ্ঞা এবং বুদ্ধিমত্তা বংলাদেশের রাজনীতিতে বড় রকমের প্রভাব ফেলেছিল। তার চলে যাওয়াটা বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
শোক জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। শোক বার্তায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণমূলক তথ্যবহুল বাংলায় এবং ইংরেজিতে বই লিখেছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার মৃত্যুতে আমি একজন প্রিয় বন্ধুকে হারালাম। আর দেশ একজন অভিজ্ঞ আইনবিদ, প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হারালো।’
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, ‘বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে প্রয়াত মওদুদ আহমদ দেশ ও জাতির কল্যাণে অনেক কীর্তি গড়েছেন। এক কিংবদন্তী রাজনৈতিক নেতার জীবনাবসান হলো। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।’
তিনি কিডনি ও ফুসফুসের জটিলতাসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন৷ গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ছিলেন৷ এর আগে থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
ফিরে দেখা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ
বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ধরে যারা প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমেদ কখনও নন্দিত, কখনও সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন বলে তাঁর সহকর্মীরা মনে করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ছিলেন মওদুদ আহমেদ।
পরে তিনি জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকারেও ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন। জেনারেল এরশাদের সরকারে থাকলেও পরে তিনি আবার বিএনপির রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
তার সহকর্মীরা উল্লেখ করেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান যেমন ছিলেন, তেমনি তিনি আইন পেশাতেও সফল ছিলেন।
স্কুল জীবন থেকেই তার দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ শুরু হয়। স্কুলের ছাত্র থাকার সময় বাংলা ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে তিনি জেল খেটেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করার পর তিনি লন্ডনে বার-অ্যাট-ল পড়তে যান। সেখানে তার পরিচয় হয়েছিল একই বিষয়ের সিনিয়র শিক্ষার্থী আমীর উল ইসলামের সাথে।
বর্তমানে সিনিয়র আইনজীবী আমীর উল ইসলাম বলেছেন, তিনি এবং মওদুদ আহমেদ বার-অ্যাট-ল শেষ করে ৬০এর দশকের মাঝামাঝি দেশে ফেরেন। তখন ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করলে তারা তার সমর্থনে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামেন।

ব্যারিস্টার ইসলাম বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি শাসকদের করা যে মামলা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল এবং যে মামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল – সেই মামলায় তিনি এবং মওদুদ আহমেদ আইনজীবী হিসাবে কাজ করেছেন।
মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় মওদুদ আহমেদকে পোস্টমাস্টার জেনারেল নিয়োগ করেছিল।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ব্যারিস্টার মওদুদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১-এ ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আহুত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকদেরও অন্যতম একজন ছিলেন তিনি।
মওদুদ আহমদ বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তিনি বিএনপির ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদে আইন ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান পাশ করে বৃটেনের লন্ডনস্থ লিঙ্কন্স ইন থেকে ব্যারিস্টার-এ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডনে পড়াশুনা করে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং হাইকোর্টে আইনপেশা শুরু করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এর ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এবং বিদেশি আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন পর্ব নিয়ে তাঁর লেখা একাধিক বই প্রশংসিত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৪ মে। তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও মা বেগম আম্বিয়া খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মওদুদ আহমদ চতুর্থ।
তাঁর স্ত্রী হাসনা জসীমউদদীন মওদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি ছিলেন। পল্লীকবি জসীমউদদীন তার শ্বশুর ছিলেন।
রূপশ্রী / এম এস







