স্বর্ণখচিত কাবার গিলাফ কিশওয়া

1534

উম্মে হামিদা বেগম

প্রতিটি মুসলিম পরিবারের শিশুরা ছোটকাল থেকেই পবিত্র কাবাঘরের ছবি দেখে বড় হয়। নিজেদের ঘরে, বই পুস্তকে বা ক্যালেন্ডারে বা সেহরি-ইফতারির সময়সূচিতে বা মসজিদের দেওয়ালেও এখন টাইলসের মধ্যে চিত্রিত কাবাঘরের ছবি দেখা যায়। কাবাঘরের ছবি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কালো কাপড়ে ঢাকা চারকোণা এক ঘরের ছবি। বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর। মুসলমানদের ঈমান, আস্থা ও বিশ্বারে প্রতীক এই ঘর। এই ঘরে জড়ানো কালো কাপড়ের উপরের দিকে জোড়া লেসের ফিতার মতো সোনালী নকশা করা নানা কারুকাজ। একপাশে আবার সোনালী কারুকার্যময় একটি দরোজার নকশা।

পবিত্র কাবাঘরের এই কালো কাপড়কে সাধারণভাবে বলা হয় গিলাফ। তবে আরবের লোকেরা বলে কিশওয়া। খাঁটি রেশম থেকে এই গিলাফ বা কিশওয়া তৈরী করা হয় বলে এর রঙ হয় কালো। কিশওয়া তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ৬৭০ কেজি খাঁটি সিল্ক। গিলাফটি যেন রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট না হয় সেজন্য খুব টেকসই ও মানসম্মত উপায়ে তৈরি করা হয়। এজন্য রেশমী কাপড়টির নিচে মোটা সাধারণ কাপড়ের লাইনিং করা থাকে। একটি গিলাফ তৈরি করতে ৪৭ টুকরো রেশমী কাপড় ব্যবহার করা হয়। গিলাফটির প্রতিটি টুকরোর দৈর্ঘ্য ১৪ মিটার ও প্রস্থ ৪৪ মিটার। প্রতি টুকরায় ব্যবহৃত স্বর্ণের সুতার ওজন ১৫ কিলোগ্রাম। ৪৭টি টুকরা জোড়া দিয়ে গিলাফটি তৈরি করা হয়। রেশমী কালো কাপড়ের উপর জোড়া লেসের ফিতার মতো সোনালি আভায় উদ্ভাসিত যে নকশা আমরা দেখতে পাই, সে নকশা করা হয় স্বর্ণমন্ডিত ও রৌপ্য মন্ডিত রেশমি সুতা দিয়ে। আর ওই নকশার নাম ক্যালিওগ্রাফি করা হয়। ক্যালিওগ্রাফিতে খচিত থাকে পবিত্র কোরআনের আয়াত। আর পুরো কিশওয়ায় ক্যালিওগ্রাফিক অক্ষরগুলো নকশা করতে প্রয়োজন হয় ১২০ কেজি সোনার সুতা, ৬৭০ কেজি রেশমী সুতা ও ১০০ কেজি রুপার সুতা। এতে খরচ হয় প্রায় ২০ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল।

গিলাফের চার কোণায় বৃত্তাকার নকশায় স্বর্ণসুতায় উৎকীর্ণ করা হয় সুরা ইখলাস। লেস ফিতার মতো বর্ডারে যার ওপর স্বর্ণসুতায় উৎকীর্ণ করা হয় কালিমা তৈয়্যব ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলাল্লাহ’, ‘আল্লাহু জাল্লে জালালুহু’, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বেহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম’ ও ‘ইয়া হান্নান, ইয়া মান্নান’।

প্রতি বছরই নির্দিষ্ট সংখ্যক শিল্পী বছরব্যাপী একান্ত শ্রম ও প্রচেষ্টায় এ নতুন গিলাফ তৈরি করে থাকেন। মক্কার নিকটবর্তী উম্মুল জুদ এলাকায় কাবার গিলাফ তৈরির একটি কারখানা রয়েছে।

প্রতি বছর হজের দিন ৯ জিলহজ তারিখে আরাফার দিন (হজের দিন) এশার নামাজের পর কাবা শরিফে চারদিক নতুন কালো রেশমী গিলাফ বা কিশওয়া দিয়ে আবৃত করে দেওয়া হয়। এই কাজ তত্ত্বাবধান করেন কাবা শরিফের প্রধান ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আব্দুর রহমান আস-সুদাইসি।

পবিত্র কাবা শরিফের পুরতান গিলাফ পরিবর্তন করে নতুন গিলাফ পরানোর জন্য ১৬০ জন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ কারিগর ও প্রযুক্তিবিদ অংশগ্রহণ করেন।

সংরক্ষিত পুরনো গিলাফ কেটে টুকরো টুকরো করে সংরক্ষণ করা হয় এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সার প্রধান, ইসলামিক স্কলার, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে খতিবের সুপারিশ ও রাজার ইচ্ছা অনুযায়ী উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।

রূপশ্রী/এইচআর/ধর্ম/ইসলাম/হজ