বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলন: টক ঝাল মিষ্টির সমাহার

457

রূপশ্রী প্রতিবেদন, ঢাকা: জাতীয় সংসদে বাজেট পেশের পরদিন বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আগে অর্থনীতি বিটের সিনিয়র সাংবাদিকরা এই অনুষ্ঠান কভার করতেন। এখনও সিনিয়র রিপোর্টার বা বিশেষ প্রতিনিধিরাই অনুষ্ঠান কভার করতে যান। তারপরও দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এই যুগের তরুণ সাংবাদিকদের জাঝালো প্রশ্ন শুনে নিরাশ হয়েছেন। পড়াশোনা করে প্রশ্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের কাছ থেকে পাওয়া উত্তর সাংবাদিকদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই টকই লেগেছে। এরমধ্যে শোনা গেছে কিছু মিষ্টি কথা, কিছু আশার বাণী।
আগামী ৬ মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আশার বাণী শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থ উপদেষ্টা ড মশিউর রহমান বলেছেন ঋণ খেলাপী কমানোর কথা। অর্থসচিব বলেছেন বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হলেও ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব পড়বে না। এসবই আশার কথা।
এবারও বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছিল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। শুক্রবার (৭ জুন) অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনটি শুরুই হয় ঝাল দিয়ে। মঞ্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে প্রথমেই সাংবাদিকরা জানিয়ে দেন বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক নিষিদ্ধ করায় এখানে তিনি কোনো বক্তব্য দিলে সংবাদ সম্মেলন বয়কট করা হবে। গভর্নরকে কোনো বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি।


সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে চলতি বছরের শেষের দিকে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করবে। এজন্য প্রায় ৬ মাস লাগে যাবে বলে জানান তিনি। এছাড়া আগামী বছরের পর
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হবেন বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন খেলাপি ঋণ কমানো সরকারের অন্যতম টার্গেট। এসময় তিনি জানান, ঋণখেলাপি একদিনের নয়, দীর্ঘদিনের। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া নৈমিত্তিক কাজ।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. মসিউর রহমান আরো বলেন, ব্যাংকে টাকা রাখলে তো সুদ বাড়ে। ব্যাংক এসব সুদ কীভাবে দেবে? এজন্য ব্যাংক টাকা বিনিয়োগ করছে। এই পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী চলমান। তাই ব্যাংকের ব্যবসা বন্ধ না করে চালু রাখতে হবে।
এমপিদের বিনা শুল্কে গাড়ি কেন দেওয়া হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এটা আমরা নই, এরশাদ সাহেব চালু করেছিলেন। একটা বিষয় চালু হলে সেটা বন্ধ করা কঠিন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সাবেক কর্মকর্তা নিয়ে আপনারা প্রশ্ন করেছেন।উনার বিচার হবে না এটা কেউ বলেননি। দুদক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তার বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ না করে তাকে জেলে বা ফাঁসি দেবো বিষয়টি এমন নয়। কারণ উনি তো এ দেশের মানুষ। বেনজীর বিদেশে আছেন, দুদকের কাছে সময় চেয়েছেন।
প্রসঙ্গত তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংকের কল্পিত দুষ্ট ব্যক্তি আমি ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী পাশে না থাকলে এখানে কথা বলতে পারতাম না। তবে এটা কানাডার আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজের টাকায় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন,
প্রস্তাবিত বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হলেও ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব পড়বে না। ব্যাংকের তারল্যের সঙ্গেও ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়া আমরা এনবিআরের সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। রাজস্ব বাড়লে ব্যাংক ঋণের ওপরে চাপ পড়বে না। অর্থসচিব আরো বলেন, এলডিসি গ্রাজুয়েশন পরবর্তী বৈদেশিক ঋণের চাপ কমাতে আমরা অভ্যন্তরীণ উৎসের দিকে আছি। আবার সঞ্চয়পত্রে সুদহার বেশি হওয়ায় সেখান থেকেও আমরা কম অর্থ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি।
অর্থমন্ত্রী ও সাংবাদিকদের টক ঝাল কাহিনী
সাংবাদিক: ‘অর্থমন্ত্রী আপনি সজ্জন ব্যক্তি, তাহলে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়াতে কেন গোঁজামিল হলো? আর একটি বিষয় হলো আপনি বলছেন—আমাদের রিজার্ভ এই অর্থবছর শেষে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে, যেটা এখন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। আপনি রিজার্ভ বাড়াবেন কীভাবে? আপনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে টাকা না ছাপিয়ে ডলার ছাপানোর দায়িত্ব দিয়েছেন কি না?’
এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘এটা একেবারেই নন-সিরিয়াস প্রশ্ন। ঠিক আছে…। এ প্রশ্ন উত্তর দেওয়ার যোগ্য নয়। আমি খুবই নিরাশ হয়েছি। ’
এ পর্যায়ে ওই সাংবাদিক কিছু বলতে গেলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আ রে বাবা আমি আপনার উত্তর দিচ্ছি। আমাকে আটকাচ্ছেন কেন, আপনাকে তো আমি আটকাইনি। আপনাকে তো ইচ্ছা মতো বলতে দিয়েছি। এখন আমারটা তো শুনতে হবে আপনাকে। ’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি অতি সরলীকরণ জিনিসটা খুবই রপ্ত করে ফেলেছেন। এগুলো তো একেবারে ওভার সিমপ্লিফিকেশন (অতি সরলীকরণ)। এইভাবে ইকোনমি চলে নাকি? হ্যাঁ, আমরা সব ছোট হয়ে গেলাম, আমাদের সব শেষ। কোথায়? আরও একটু পড়ে-টড়ে আসবেন। এইভাবে অতি সরলীকরণ করবেন না একটু ম্যাচিউরিটি নিয়ে আসেন। ’
আরেক সাংবাদিকের প্রশ্ন, ‘বাজেট বক্তব্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় কোনো বার্তা দেখিনি। আর্থিক খাতের দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে আজকে আপনি কী বলবেন? কেন বার্তা দিচ্ছেন না, আপনার ওপর কি কোনো চাপ আছে?’
অর্থমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেন, ‘আমরা তো বলছি খোলাখুলি। বিফোর দ্য ওয়ার্ড, বিফোর আওয়ার অডিয়েন্স, বিফোর আওয়ার পিপল (সবার সম্মুখে)। আমরা তো কোনো রাখঢাক করিনি। তো আপনি খালি ঘুরে-ফিরে ওই একই কথায় যাচ্ছেন, কেন? এটা তো বুঝতে পারলাম না। এটা কী ধরনের প্রশ্ন?’ তিনি আরও বলেন, ‘কীভাবে প্রশ্ন করে, এগুলো তো শিখতে হবে আপনাদের। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে। কারণ এটা কোনো জার্নালিজম না। খালি এক কথায় ঘুরে ফিরে বলেন এবং অতি সরলীকরণ। এভাবে চলে নাকি? সমাজ, সংসার এভাবে চলে? কোথাও চলে না? এগুলো (বাজেট বক্তব্যের বই হাতে নিয়ে) দেখেন, দেখে একটু শেখেন। তাহলে আমাদেরও কাজ করতে সুবিধা হবে। ’
আরেক সাংবাদিকের প্রশ্ন: পণ্যের দাম কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিতভাবে প্রতিফল ঘটে না। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে কি না?
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে কাজ করার চেষ্টা করছি এবং সাংবাদিকরাও তো আমাদের সাহায্য করছেন। এটা কী ধরনের প্রশ্ন করলেন, সমন্বয় করা হবে কি না ?অবশ্যই করা হবে। ’
আরেক প্রশ্ন: ‘প্রস্তাবিত বাজেটে এমপিদের গাড়ি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু আইনে এখনো আছে। আইন কবে, কখন সংশোধন করবেন?’ অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কবে, কখন করবেন এটা কেউ বলে নাকি? আপনি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, কবে করবেন এটা, এ রকম হয় না। আইনটা সংশোধন করতে হবে। হ্যাঁ বলেছি তো করার জন্য। ’ এসময় তিনি আরো বলেন, ‘একটা জিনিস বলতেই হবে, লাস্টের প্রশ্নটা ভালো প্রশ্ন ছিল। সিরিয়াস প্রশ্ন। কিন্তু আমি দেখলাম বেশিরভাগই হলো খুবই ইম্যাচিউরড। পড়েননি, এই যে বইটা (বাজেট বক্তব্যের বই হাতে ধরে) দিয়েছি আমরা, বইটা পড়েন। ’

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, পরিকল্পনামন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব) আব্দুস সালাম, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুস শহীদ, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু, অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার’