নারীর কর্মসংস্থানে ৪৪১ কোটি টাকার প্রকল্প

প্রশিক্ষণ পাবে আড়াই লাখ নারী

862

রূপশ্রী প্রতিবেদন

২০ জানুয়ারি, ঢাকাঃ

বিশ্বায়নের সাথে সাথে দেশের নারীরা এখন সৌন্দর্য চর্চায় অনেক সচেতন এবং সৌখিন হয়ে উঠেছেন। সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে সৌন্দর্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। সরকার সম্ভাবনাময় এই খাতকে সামনে রেখে নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়াতে ৪৪১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেছে। প্রকল্পের আওতায় আড়াই লাখ নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যা বর্তমানে সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় দেশের ৮০টি উপজেলায় বিউটি পার্লার স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া বিউটি পারলারের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য ৮০টি ফুড কর্নারও করে দেওয়া হবে। নির্বাচিত ৮০টি উপজেলায় নারীদের জন্য স্থাপন করা হবে বিক্রয় ও প্রদর্শনীকেন্দ্র। এ ক্ষেত্রে এককালীন অর্থ সাহায্য দেবে সরকার।

পরীক্ষামূলকভাবে দেশে ১৪টি বিউটি পারলার স্থাপন করে সফলতা পাওয়ার পর নতুন করে আরও ৮০টি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ‘তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ সাধন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

যেসব নারী জাতীয় মহিলা সংস্থার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ নেবেন,তাঁদেরকেই বিউটি পারলার,ফুড কর্নার ও বিক্রয়কেন্দ্র করে দেওয়া হবে। ৫ থেকে ১০ জন মিলে একেকটি বিউটি পারলার পরিচালনা করবেন। একই সঙ্গে বিউটি পারলার সাজাতে যেসব উপকরণ প্রয়োজন হয়; সেসবও সরবরাহ করা হবে।

একই পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে ফুড কর্নার ও বিক্রয়কেন্দ্র।  তবে বিউটি পারলার, ফুড কর্নার এবং বিক্রয় ও প্রদর্শনীকেন্দ্র ভাড়া নিতে হবে নারী উদ্যোক্তাদের।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের আলোকে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এমন ৮০টি উপজেলা বাছাই করা হয়েছে এই প্রকল্পের জন্য। এর মধ্যে কয়েকটি হলো ঢাকার সাভার,মানিকগঞ্জের ঘিওর,নরসিংদীর রায়পুরা,গাজীপুরের কালিগঞ্জ ও নীলফামারীর ডিমলা। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

জাতীয় মহিলা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় সারা দেশ থেকে ২ লাখ ৫৬ হাজার নারী বাছাই করে তাঁদের ছয় মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিদিন একজন নারী প্রশিক্ষণার্থীকে দেড় শ টাকা করে দেওয়া হবে। কারা দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ পাবেন, তার মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির কম পড়ালেখা এমন কেউ এই প্রশিক্ষণ পাবেন না। এসএসসি ও এইচএসসি পাস অনেক নারী এই সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

জাতীয় মহিলা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন,এর আগে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নেওয়া প্রকল্পে ইতিবাচক ফল মিলেছে। আগে জেলা পর্যায়ে সরকারের এই কার্যক্রম থাকলেও সেটি এখন উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে,যাতে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র নারীরাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারেন।

উপজেলা পর্যায়ে নারীদের জন্য  বিউটি পারলার,ফুড কর্নার এবং বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে  বরিশালের  বানারিপাড়া উপজেলার  প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমীন গণমাধ্যমকে জানান, এর ফলে মেয়েদের যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে  তেমনি সেখানকার সৌন্দর্যপ্রিয় মেয়েরাও সহজে  এ সেবা নিতে পারবেন।

এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি হাসিনা নেওয়াজ বলেন, বিউটি পারলার ও ফুড কর্নার দেশে বেশ জনপ্রিয়। তবে বিউটি পারলারে নারীদের অংশগ্রহণ যতটা, ফুড কর্নারে ততটা নয়। সরকার যদি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিউটি পারলার ও ফুড কর্নার করে দেয়, সেটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু বিউটি পারলার ও ফুড কর্নার করে দিলেই হবে না, নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাও করে দিতে হবে। কারণ, নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যাংকে যাতায়াত নেই। তাই তাঁদের পক্ষে ঋণ পাওয়া কঠিন।

অতিরিক্ত সচিব আনোয়ারা বেগমও বলছেন, ব্যবসা করতে গিয়ে নারী উদ্যোক্তাদের হয়রানিতে পড়তে হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পেতে সমস্যা হয়। অনেকে পণ্য বিপণনের পদ্ধতি জানেন না। অনেকে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের পদ্ধতিও জানেন না। প্রশিক্ষণে এসব বিষয় শেখানো হবে।

এ প্রকল্পের আওতায় আট কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ, শিক্ষা ভ্রমণ ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাতে। চলমান করোনার অতিমারির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভ্রমণ খাতে আট কোটি টাকা বাদ দিতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন। পরে পরিস্থিতি অনুকূলে হলে বিদেশ ভ্রমণ করা যেতে পারে বলে মনে করে কমিশন।

জাতীয় মহিলা সংস্থার তথ্য আরও বলছে, নতুন নেওয়া প্রকল্পটির আওতায় নারী উদ্যোক্তারা যাতে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সহজে বিপণন করতে পারেন, সে জন্য একটি ক্রয়–বিক্রয় সফটওয়্যার তৈরি করা হবে। এ ছাড়া জাতীয় মহিলা সংস্থার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত কতসংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত নারী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, প্রকল্পটির আওতায় এর একটি ডেটাবেইস সফটওয়্যার তৈরি করা হবে। তবে এ প্রকল্পের আওতায় সুবিধাবঞ্চিত এবং নারী উদ্যোক্তা বাছাইয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া যাতে অনুসরণ করা হয়, সেই তাগিদ দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

রূপশ্রী / এম এস