রূপশ্রী ডেস্ক
রবিবার, ১৭ই মে ২০২০, ঢাকা:
বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালীন সময়ে সবাই ভয় এবং আশংকায় দিনযাপন করছে। এই সময়ে গর্ভবতী নারী এবং তাদের পরিবা্রের আশংকা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে, করোনা মহামারীর মধ্যেই আনুমানিক ২.৪ মিলিয়ন শিশু জন্মগ্রহণ করবে বলে পরিসংখ্যানে এসেছে। বিশ্বব্যাপী এই সংখ্যাটি ১১৬ মিলিয়ন। এই শিশুরা কোভিড-১৯ -এর ৪০ সপ্তাহ অবধি জন্মগ্রহণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসময় গর্ভবতী নারীদের উপর করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি, প্রভাব ও ঝুঁকি কমানোর উপায় সম্পর্কে আসুন জেনে নেই।
সম্প্রতি স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ গর্ভবতী নারীদের জন্য করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি এবং ঝুঁকি এড়ানো সম্পৃক্ত কিছু দিক নির্দেশনা প্রকাশ করেছে।
যুক্ত্যরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ান এন্ড গায়নোকোলোজিস্ট (RCOG) এই সম্পর্কে বলে, সাধারন মানুষ ঠিক যতটুকু ঝুঁকিতে থাকে গর্ভবতী নারীরাও ঠিক ততটুকু ঝুঁকিতে থাকে। গর্ভবতী নারীরা আলাদাভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকে কিনা এমন কোন তথ্য উপাত্ত এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।
সিডিসি’র ওয়েবসাইটে একই কথা বলা হয়েছে, গর্ভবতী নারীদের করোনাতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি কিনা সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি ।
তবে গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এসময় কিছু কিছু ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়, তাই এসময় কিছু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
গর্ভের শিশুর মধ্যে করোনা সংক্রমণের সম্ভাবনা
গর্ভের শিশুর মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে রয়্যাল কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ান এন্ড গায়নোকোলোজিস্ট (RCOG) -এর প্রেসিডন্ট এডওয়ার্ড মরিস বলেন, “মায়ের করোনা ভাইরাস হলে সেটা গর্ভের শিশুর মধ্যে সংক্রমণ হতে পারে, এমন কোন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।তিনি আরো বলেন, তাই এমুহূর্তে এটুকু বলা যায় যে গর্ভবতী নারীর করোনা হলে গর্ভের শিশুর জন্মগত ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে প্রতিনিয়ত যেসব তথ্য আসছে তার ভিত্তিতে পরবর্তীতে এসব নির্দেশনা পরিবর্তিত হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে চায়নাতে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেয়া কিছু গর্ভবতী নারীর সঠিক সময়ের আগেই প্রসব হতে দেখা যায়। তবে এটা ঠিক করোনা ভাইরাসের কারনে হয়েছে নাকি গর্ভবতী নারীর শারীরিক অসুস্থতার কারনে ডাক্তাররা সময়ের আগে প্রসবের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
১৮ই মার্চে প্রকাশিত একটি দুটি ক্ষেত্রে মা থেকে সন্তানের করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমনের কথা বলা হয়েছে। তবে দুটি কেসের ক্ষেত্রেই এই সংক্রমন গর্ভে থাকাকালীন সময়ে হয়েছে না জন্মের ঠিক পরপর হয়েছে সেটা নিয়ে পরিস্কারভাবে কিছু বলা হয়নি।
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিছু মায়ের এম্নিওটিক ফ্লুইড, কর্ড ব্লাড এবং নবজাতকের গলা থেকে নমুনা নিয়ে করা পরীক্ষার করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অন্য আরেকটি গবেষণায় তিনজন আক্রান্ত মায়ের প্লাসেন্টার নমুনা থেকেও নেগেটিভ ফলাফল পাওয়া গেছে।
এসব গবেষণার ফলাফল থেকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের থেকে গর্ভের শিশুর মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমনের সম্ভাবনা কম।
গর্ভাবস্থায় করোনার প্রভাব
গর্ভবতী নারীরা এসময় করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের মধ্যে সাধারন ফ্লু এর লক্ষন দেখা দিতে পারে। তবে লক্ষনগুলির তীব্র আকার ধারন করার সম্ভাবনা কম এবং এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের কারনে কোন গর্ভবতী নারীর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া করোনা ভাইরাস হলে গর্ভপাত হতে পারে এমন কোন উপযুক্ত তথ্য প্রমাণও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি এবং এই ভাইরাসের কারনে ভ্রূণের মধ্যে কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়ার সম্ভাবনাও কম।
সংক্রমণ এড়ানোর উপায়
আন্তর্জাতিক কনফেডারেশন অফ মিডওয়াইভসের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কা ক্যাডি বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়ানোর জন্য গর্ভবতী নারী এবং তার পরিবারের বাকিদের সরকারী নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।
- নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
- আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ কাশি বা হাঁচি দিলে টিস্যু ব্যবহার করুন, ব্যবহারের পর এটিকে নির্দিষ্টস্থানে ফেলে দিন এবং আপনার হাত ধুয়ে নিন।
- কারোনাভাইরাস রোগের লক্ষণ আছে (জ্বর ও হালকা ঠাণ্ডা) এমন কারও সাথে যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন।
- সম্ভব হলে গণপরিবহন এড়িয়ে চলুন।
- বাড়ি থেকে কাজ করুন।
- পাবলিক স্পেসগুলি এড়িয়ে চলুন।
- বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সাথে আড্ডা এড়িয়ে চলুন।
- আপনার প্রসূতি বিশেষজ্ঞ বা গাইনী ডাক্তার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সমস্যার সমাধানের জন্য টেলিফোন বা অনলাইন সেবা ব্যবহার করুন।

সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো কতটা নিরাপদ
মায়ের দুধ বা বুকের দুধের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে এমন কোন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ক্যাডি এবিষয়ে বলেন, “যতদূর আমরা জানি, স্তন্যপান চালিয়ে যাওয়া পুরোপুরি নিরাপদ। অবশ্যই একজন মা তার শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পুষ্টিকর খাবার মায়ের দুধ তাকে খাওয়াতে পারবে।”
সিডিসি’র ওয়েবসাইটেও বলা হয়েছে, নবজাতক শিশুর পুষ্টির সবচেয়ে সেরা উৎস হল মায়ের বুকের দুধ। তবে এই সংক্রমণের মধ্যে কিভাবে সঠিক উপায়ে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো যেতে পারে সে বিষয়ে কোন দিক নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
যদিও বুকের দুধের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কোন আশংকা নেই বললেই চলে, তবে অন্য মাধ্যমে শিশুর মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। তাই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়েদের সব ধরনের সতর্কতা নিতে বলা হয়েছে।
যেমন ফেস মাস্ক পরে শিশুকে দুধ খাওয়ানো, দুধ খাওয়ানোর আগে ও পরে হাত ধোওয়া এবং জীবাণুনাশক ব্যবহার করা, শিশুর সবকিছু জীবাণুমুক্ত করা। যদি আপনি অসুস্থতার কারনে শিশুকে দুধ খাওয়াতে না পারেন, তাহলে পাম্প দিয়ে দুধ সংরক্ষণ করে দুধ খাওয়ান। প্রথমে পাম্পটি জীবাণুমুক্ত করে তারপর দুধ সংরক্ষন করবেন। নিজের হাত পাম্প করার আগে ও পরে ভালো ভাবে ধুয়ে নিবেন। একটি পরিষ্কার কাপ এবং চামচের সাহায্যে দুধ খাওয়ান। খাওয়ানোর আগে অবশ্যই কাপ এবং চামচ জীবাণুমুক্ত করে নিবেন। প্রয়োজনে অন্য কারো সাহায্যে পাম্প করাতে পারেন। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার সাথে কাজটি করুন এবং সতর্কতা অবলম্বন করুন।
করোনা ভাইরাসের উপসর্গ আছে বা করোনা আক্রান্ত যে কেউ শিশুসহ অন্য যে কারো কাছে গেলে উপরোক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
উল্লেখ্য, মায়ের বুকের দুধ এবং গর্ভে থাকা এম্নিওটিক ফ্লুইড পরীক্ষা করে এখন পর্যন্ত সেখানে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়নি। তবে যদি আপনার সন্দেহ হয় যে আপনার করোনা ভাইরাস থাকতে পারে তবে দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিন এবং আপনার ডাক্তারের নির্দেশাবলী অনুসরণ করুন।
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মা ও শিশুকে অন্যান্য শিশুদের কাছ থেকে ১৪ দিন আলাদা রাখার পরামর্শ দেয়া হয় যাতে অন্যদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াতে না পারে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যখন গর্ভবতী নারী
বিশ্বজুড়ে অনেক মহিলাই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকেন, যেখানে শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা অনেক চ্যালেঞ্জিং। এ জাতীয় জায়গাগুলিতে, “আমি সত্যিই পুরো এলাকাকে (কমিউনিটি) তাদের গর্ভবতী মহিলাদের যত্ন নেওয়ার জন্য বলব,” ক্যাডি অনুরোধ জানায়। তিনি সুপারিশ করেন যে লোকেরা যতটা সম্ভব গর্ভবতী মহিলাদের থেকে তাদের দূরত্ব বজায় রাখবে এবং তাদের জন্য নির্দিষ্ট শৌচাগার আলাদা করে দিবে।
এছাড়া এলাকার লোকদের হাত ধোয়ার গুরুত্বটি অবশ্যই ভুলে যাওয়া যাবে না। “শুধু শুধু সবাইকে হ্যান্ড ওয়াশ করতে বলা হয়নি। কোভিড ১৯ এবং সাবান একে অপরকে পছন্দ করে না। এই একটি সহজ পদ্ধতি আমাদেরকে করোনা মোকাবেলায় অনেক সাহায্য করতে পারে।’’ তিনি আরও বলেন,“আমি সত্যিই আশাবাদী যে মানুষ যেই পরিস্থিতির মুখোমুখিই হোক না কেন, এলাকার লোকজন এবং স্বাস্থ্যসেবা দানকারীরা এমন একটি সিস্টেমের কথা ভাববেন, যা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য নিরাপদ এবং সুরক্ষিত হবে। কারন গর্ভবতী নারীরাই আমাদের ভবিষ্যতের জন্ম দিচ্ছে। তাদের সঠিক পরিচর্যা করা সবচেয়ে জরুরী।’’
করোনায় আক্রান্ত হলে করনীয়
গর্ভবতী নারীরা যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন বা করোনা ভাইরাসের লক্ষণ দেখতে পান তাহলে সরকার প্রদত্ত জরুরী নাম্বারে কল করতে হবে। ফোনে তাদেরকে আপনার লক্ষণসমূহ এবং আপনি যে গর্ভবতী নারী তা অবশ্যই জানাতে হবে।
আইইডিসিআর এর হটলাইনে যোগাযোগ করে আপনার লক্ষণ জানালে তারা আপনার বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে আসবে।
ফোন নাম্বারঃ
- ০১৯২৭৭১১৭৮৪
- ০১৯২৭৭১১৭৮৫
- ০১৯৩৭০০০০১১
- ০১৯৩৭১১০০১১
উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাসের লক্ষণ সাধারন ফ্লুর মতই, জ্বর এবং (নতুন) কাশি। যদি করোনা ভাইরাস পরীক্ষার প্রয়োজন হয় তাহলে আপনাকে ১৪ দিন আইসোলোশনে থাকার পরামর্শ দিবে এবং সাধারন করোনা আক্রান্তদের মতই করোনা টেস্ট করা হবে। আপনি ১৪ দিন কারো সংস্পর্শে আসতে পারবেন না।
তবে এই সময়েও নিয়মিত মাতৃত্বকালীন পরীক্ষা নিরীক্ষাগুলি করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে আপনার বিশেষজ্ঞ গাইনি ডাক্তারকে জানাতে হবে যে আপনি করোনা আক্রান্ত বা করোনা সন্দেহে আইসোলেটেড অবস্থায় আছেন।
গর্ভবতী নারীর যদি কোন ধরনের জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে তার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে জানাতে হবে, প্রয়োজনে ডাক্তার বিশেষ ব্যবস্থায় গর্ভবতী নারীকে আলাদা রেখে সব ধরনের সতর্কতার মধ্যে চিকিৎসা প্রদান করবেন।
সর্বোপরি, আতংকিত না হয়ে সাহসের সাথে এই সময়ের মোকাবেলা করতে হবে। আমাদের মানসিক শক্তি শারীরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন।







