পবিত্র হজ আজ

909

রূপশ্রী প্রতিবেদন

ঢাকা: আজ বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ। হাজিরা অশ্রসজল চোখে সৌদি আরবের মিনা থেকে হাজির হয়েছেন আরাফার প্রান্তরে। তাঁরা কাতর কন্ঠে চিৎকার করে ঘোষণা করছেন, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়া ন্নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।’ আজ আরাফার প্রান্তরে শুধুই ধ্বনিত হচ্ছে, ‘হে আল্লাহ আমি হাজির! আমি উপস্থিত! আপনার কোন অংশীদার নেই। (এই সত্যের ঘোষণা দিতে) আমি হাজির। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা আপনার ও সম্পদরাজি আপনার এবং রাজত্বও একমাত্র আপনারই। আপনার কোন অংশীদার নেই।’

প্রতিবছর হিজরি মাসের ৯ জিলহজ তারিখে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হয়। সৌদি আরবের দিনপঞ্জী অনুযায়ী আজ সেই পবিত্র দিন। পবিত্র হজব্রত পালনে প্রতি বছর মক্কায় সমবেত হয় ধর্মপ্রাণ লাখো নারী-পুরুষ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কোন ভেদাভেদ ছাড়াই তাওয়াফ করে আল্লাহর ঘর। সায়ী করে সাফা-মারওয়া। আরাফা, মিনায় ও মুজদালিফায় কেউ নারী নয়, কেউ পরুষ নয়-সবার একটাই পরিচয়, হাজি। এক সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে পালন করে হজের সকল আনুষ্ঠানিকতা। তবে করোনা মহামারির কারণে আরাফার প্রান্তরে আজ নেই লাখো মানুষের ঢল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে নামমাত্র ধর্মীয় অনুশাসন রক্ষায় সীমিত আকরে পালিত হচ্ছে এই হজ। তাই পৃথিবীর মুসলমানেরা এবার টিভিতে হজের লাইভ অনুষ্ঠানে লাখো মুসল্লির হজ পালনের সেই চিরায়ত দৃশ্য দেখতে পাবেন না। সাধারণত প্রতিবছর ২০-২৫ লক্ষাধিক হাজির পদচারণা মুখর থাকত, এবার হজ করছেন মাত্র ১ হাজার হাজি।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় বিধি নিষেধের কারণে হজ পালনের অনুমোদন পাওয়ার পরও আল্লাহর ঘরের তাওয়াফকারীরা এবার পবিত্র কাবা ঘর স্পর্শ করা তো দূরের কথা কাবাঘরের কাছেও যেতে পারবেন না। তাওয়াফ হবে সামাজিক দুরত্ব মেনে ও মাস্ক পড়ে। এমনকি পাপমুক্তির জন্য পবিত্র ‘হাজরে আসওয়াদ’ পাথরে চুমু খেতেও পারবেন না হাজিরা। হজের কার্যক্রম শুরুর আগেই খাদেমুল হারমাইন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা কালো পাথরের মুখ আবরণ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। তবে আজ আরাফাতের প্রান্তরে শুধু ইহরামের কাপড় পড়ে হাজির হওয়ার ধর্মীয় নির্দেশনার কারণে আরাফাতের প্রান্তরে সমবেত হাজিদের মাস্ক পরিধান করতে হবেনা। ইসলামের ইতিহাসে ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে গুরুত্ব অপরিসীম। এখানেই সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণের সময় আল্লাহ পবিত্র কোরআনের আয়াত নাজিল করে ইসলামের পূর্ণতার ঘোষণা দেন। এখানে হাজিরা আজ তারই ধারাবাহিকতায় হজের একটি খুৎবা শুনবেন। মসজিদে নামিরাহ থেকে হজের খুতবা পাঠ করা হবে। খুতবা বাংলাসহ ১০টি ভাষায় অনূদিত হবে। আরাফাতের ময়দানে এই দৃশ্য বিভিন্ন দেশের টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। খুৎবার পর হাজিরা জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজিরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে ইবাদত-বন্দেগি করবেন। তবে এসময় অবশ্যই হাজিদের পরস্পর থেকে দেড় মিটার দূরে দূরে নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করতে হবে।

আরাফাতের ময়দান থেকে হাজিরা যাবেন মুজদালিফা এবং সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করে রাতযাপন করবেন। সাধারণত হাজিদেরকে মুজদালিফায় অবস্থানকালে শয়তানকে ছুড়ে মারার জন্য রাতের বেলা কঙ্কর সংগ্রহ করতে হতো। এবার তা করতে হবে না। এবার আগে থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সংগৃহিত ও জীবাণুমুক্ত প্যাকেটজাত পাথর সরবরাহ করবেন। হাজিদের সেটাই ব্যবহার করতে হবে। তাই মুজদালিফায়ও হজ পালনকারীদের বিধিবিধান কড়াকড়িভাবে মেনে চলতে হবে। নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করতে হবে।

ইসলামের বিধান মোতাবেক, আরাফা থেকে মুজদালিফা হয়ে মিনায় ফিরার পর হাজিদের পর্যায়ক্রমে চারটি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। শয়তানকে (জামারা) পাথর নিক্ষেপ, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু কোরবানি (অনেকেই মিনায় না পারলে মক্কায় ফিরে গিয়ে পশু কোরবানি দেন), মাথা ন্যাড়া করা এবং তাওয়াফে জিয়ারত।

যাইহোক, শুক্রবার ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে মিনায় ফিরবেন হাজিরা। মিনায় ফিরে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে হাজিরা জামারায় পাথর নিক্ষেপের জন্য রওনা দেবেন। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে যাওয়ার আগেই জামারাতুল আকাবায় (বড় শয়তান) সাতটি পাথর নিক্ষেপ করবেন। পাথর নিক্ষেপের পর আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তারা পশু কোরবানি করবেন। এরপর মাথা মুন্ডন করবেন। এ ছাড়া প্রথম দিনের কঙ্কর মারা শেষ হলে চলমান হজ কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব হাজীকে মিনায় নির্দিষ্ট তাঁবুতে আবস্থান করতে হবে। মিনায় দুই দিন অর্থাৎ ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে হাজিদের একইভাবে প্রতিদিন শয়তানের উদ্দেশে কঙ্কর মারতে হবে। সেখানে ছোট জামারা, মধ্য জামারা ও বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে হাজিরা মিনা ত্যাগ করবেন।

এরপর মক্কায় ফিরে হাজিরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সায়ী করবেন বা দৌড়াবেন। তারপর বিদায়ী তাওয়াফ করবেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের তাওয়াফের জন্য কাবাঘরের চারপাশ এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ানোর স্থানকে প্রতি দল হাজির ব্যবহারের আগে ও পরে জীবাণুমুক্ত করার ববস্থা করেছে। তারপরও বাড়তি সতর্কতা হিসেবে কাবাঘরে নামাজ আদায়ের জন্য নিজস্ব জায়নামাজ আনার বাধ্যবাদকতা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া কোন হাজি যাতে পবিত্র কাবাঘর ও কালো পাথরের কাছে যেতে না পারেন সে জন্য এর চারপাশে কৃত্রিম দেয়াল তুলে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। জমজমের কূপ এলাকায়ও হাজিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তবে বোতলে করে হাজিদের জমজমের পানি সরবরাহ করা হয়। সর্বোপরি হজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রত্যেক হাজিকে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগেও হাজিদের সাতদিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। এ বছর সীমিত পরিসরে হজ পালনের জন্য এসব বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি জারি করে সৌদি আরবের জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

এরআগে গত মঙ্গলবার এশার নামাজ শেষে পবিত্র কাবা শরীফ তাওয়াফ করে শুরু হয় হজের আনুষ্ঠানিকতা।

আল্লাহর ঘর তাওয়াফ শেষে মক্কা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পবিত্র মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন হাজিরা। গতকাল বুধবার তারা মিনায় সারাদিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। এসময় মিনার তাঁবু এলাকার ৫০ বর্গমিটারের মধ্যে ১০ জনের বেশি হাজির সমবেত হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। প্রত্যেককে মিনার তাঁবুতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাটাতে হয়। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে এবার পবিত্র হজ পালন করছেন মাত্র ১ হাজার হাজী। করোনা মহামারীর কারণে নিবন্ধনকৃত ১০ হাজার হজযাত্রীর মধ্যে মাত্র ১ হাজার জনকে নির্বাচিত করা হয়। এরপর গত ১৯ জুলাই থেকে এসব হাজিকে আবাসিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। এখানেই হজের প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ করেন হাজিরা। এবার কোনো বিদেশিকে হজ করতে যাওয়ার সুযোগ দেয়নি সৌদি আরব। গত প্রায় ৯০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম বহির্বিশ্বের লোকদের জন্য হজে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে যারা আগে থেকে সেখানে অবস্থান করছেন শুধু তারাই এবার হজ পালন করতে পারবেন। সে সুযোগে এবারই প্রথম সৌদি আরবে অবস্থানকারী বিশ্বের ১৬০টি দেশের নাগরিকরা পবিত্র হজে অংশ নিচ্ছেন। এবার হজে অংশ নেওয়া সব হাজির খরচ বহন করছে সৌদি সরকার।

করেনা মহামারীর কারণে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থার পরামর্শে এবার হজের সকল কার্যক্রমে হাজিদের ২০ জনের দলে ভাগ করে অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা ও জামারায় অবস্থান ও যাতায়াতের সময়ও এ নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হয়।

আরব নিউজ ও আলজাজিরা জানায়, প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ বার জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে কাবাঘর ও আশপাশের স্থানগুলো। ১৮ হাজারেরও বেশি কর্মী এসব কাজে নিয়োজিত। হজের জন্য নির্দিষ্ট অন্য শহরগুলোর পরিচ্ছন্নতার জন্যও রয়েছেন ১৩ হাজার কর্মী। এবার বিশ্বের কোনো দেশ থেকেই কেউ হজে যাওয়ার সুযোগ পাননি। তবে সৌদিতে অবস্থানরত হাতেগোনা কিছুসংখ্যক বাংলাদেশি এই বিরল সুযোগ পেয়েছেন। এবার হজে অংশ নেওয়া হাজিদের ৭০ ভাগ প্রবাসী, বাকি ৩০ শতাংশ দেশটির নাগরিক।

#

রূপশ্রী/ধর্ম/ইসলাম/এইচআর/