বাংলাদেশের বাড়ছে নারী পর্যটক

949

রূপশ্রী ডেস্ক

মঙ্গলবার (১৯ মে), ঢাকা: আমাদের দেশের পর্যটন সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন এই পেশার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে মাঠপর্যায়ের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সে থেকে বলতে পারি, নানা প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নারী পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যদিও আনুপাতিক হারে পর্যটন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর সংখ্যা ততটা বাড়ছে না।

বলছিলেন বিয়ন্ড এডভেঞ্চার অ্যান্ড ট্যুরিজম-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আখতারুজ্জামান। এ বিষয়ে তিনি আরো জানান, এক দশক আগে বাংলাদেশে ট্রাভেল এজেন্সির সংখ্যা ছিল পনের’শ। বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। এর মধ্যে নারী উদ্যোগতাও আছেন। তবে শুধু লাইসেন্সের স্বার্থে অনেকক্ষেত্রে অনেকে স্ত্রীর নাম দিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, সেগুলো বাদ দিলেও পর্যটন সেক্টরে একন প্রকৃত নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন বিশজনের বেশি। বর্তমানে ট্যুর অপারেটরদের এসোসিয়েশন টোয়াবের ৬৭২ জন সদস্যের মধ্যে নারী সদস্য ২০/২৫ জন। এ কারণে বলতেই হবে যে, আমরা এগিয়ে চলছি।

সৈয়দ আখতারুজ্জামান আরো জানান, বাংলাদেশে নারী পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভ্রমণের ধরনও পাল্টে গেছে। ব্যতিক্রম ছাড়া আগে কোনো নারী পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন ছাড়া ভ্রমণ করতেন না। কিন্তু এখন প্রচুর সংখ্যক নারী বন্ধুদের সঙ্গে কিংবা সামান্য জানাশোনা আছে, এমন গ্রুপের সঙ্গেও একা ভ্রমণ করছেন। এখন বর্তমানে একটা বড় অংশের নারী শুধু নারীদের সঙ্গেই ভ্রমণ করেন। তাদের সংগঠনও রয়েছে। বছরের নানা মৌসুমে, ছুটিতে তারা বড় গ্রুপে একসঙ্গে ভ্রমণ করছেন, যেখানে তার পরিবার বা আত্মীয়দের কেউ নেই। অধিকাংশই অপরিচিত বা এই ভ্রমণে এসে পরিচয় ঘটেছে।

বাংলাদেশে পর্যটন গবেষণার যথাযথ প্রয়োগ  না থাকলেও বিস্তর গবেষণা হচ্ছে দুনিয়াজুড়ে।

জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কিংবা ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের গবেষণা ও জরিপ থেকে পর্যটনে নারীদের ভূমিকা নিয়ে  বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে। ইউএনডব্লিউটিওর পরিসংখ্যান মতে, ২০১৯ সালে সারা বিশ্বে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। যা ২০১৮ সালের তুলনায় অন্তত ৪ শতাংশ বেশি। এই বিশাল সংখ্যক পর্যটকের অন্তত অর্ধেক নারী। কোনো কোনো পরিসংখ্যান বলছে, এই সংখ্যা অর্ধেক নয় বরং তারচেয়েও বেশি, প্রায় ৬৩ শতাংশ। ফলে পর্যটনখাতে নারীর ভূমিকা যে কতটা প্রবল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এছাড়া এসব গবেষণায় উঠে এসেছে, পুরুষ পর্যটক যখন ভ্রমণ করে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান ভূমিকা রাখে নারী। বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের রিপোর্টে দেখা গেছে, ভ্রমণসঙ্গী, ভ্রমণ ব্যয় এবং ভ্রমণ গন্তব্য এই তিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ ভূমিকা নারীর।

গবেষনায় আরো জানা যায়, নারী পর্যটকদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সের নারীরাই সবচেয়ে বেশি (৪৬ শতাংশ)। সুতরাং ২৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সের নারীরা পর্যটনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছেন। খুব ভালো হতো যদি আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই তথ্যগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন।

বৃটেনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান কন্ডোর ফেরিস দেয়া তথ্য মতে, “ফিমেল সলো ট্রাভেল” লিখে ইন্টারনেটে সার্চের পরিমাণ গত তিন বছরে ৬২ শতাংশ বেড়েছে। আমেরিকার ৬৫ শতাংশ নারী তাদের স্বামী বা পার্টনার ছাড়াই ভ্রমণ করেন। তাই দেশ, সংস্কৃতি ও সামাজিকতা ভেদে এই পরিবর্তনের মাত্রা পাল্টে যায়।

ইংল্যান্ডের ২৭ শতাংশ পর্যটন ব্যবসায়ী মনে করেন, যখন নারীরা পর্যটন সেবা নেন, তখন দর্শনীয় স্থান দেখা আর শপিং-এর ওপর বেশি জোর দেন। জরিপে দেখা গেছে যারা, যারা এ্যাডভেঞ্চার, কালচার এবং প্রকৃতিনির্ভর ট্যুর বুক করেন, তাদের ৭৫ শতাংশই নারী। তবে ইংল্যান্ড, আমেরিকা বা ইউরোপের এই দৃশ্যের মতো এশিয়াতেও একই চিত্র হবে তেমনটা ভাববার কারণ নেই। তবে এক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার উপায়গুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এ বিষয়ে প্রথমেই প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন। পর্যটন সেবা সংশ্লিষ্ট সকলের পুরষতান্ত্রিক মানসিকতা দূর করে আন্তরিক ও সহযোগিতামূলক নারী বান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ, যা সার্বিকভাবে দেশের পর্যটনখাত তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জোড়ালো ভূমিকা পালন করতে পারবে।

এছাড়া সরকার, পর্যটন ব্যবসাযী ও উদ্যোক্তারা মিলে নারীবান্ধব পর্যটন উন্নয়নে পর্যটন স্থানের আবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপদ আবাসন, আঞ্চলিক শপিং ব্যবস্থাপনা, অ্যাডভেঞ্চার গন্তব্যগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে নারীবান্ধব পর্যটন উন্নয়নে কাজ করতে পারে।

#

রূপশ্রী/এইচ