না ফেরার দেশে কবি আলেয়া চৌধুরী

811

রূপশ্রী প্রতিবেদন

ঢাকাঃ

বাংলাদেশের একজন সংগ্রামী সাহসী নারী, লড়াকু কবি আলেয়া চৌধুরী গত ৪ জুলাই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর চলে যাওয়ায় যেন শেষ হল- একটি লড়াকু সংগ্রামী প্রজন্মের, একটি সাহসী চেতনার। কবির বন্ধু ও প্রকাশক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল তাঁর মৃত্যুতে তাঁকে স্মরণ করে ফেসবুকে যেই পোস্ট দিয়েছেন, আমরা তা পাঠকের কাছে তুলে ধরলাম-

“না ফেরার দেশে চলে গেলেন কবিবন্ধু আলেয়া চৌধুরী। খরবটা জেনে মন বিষণ্ণ হয়ে গেলো; সাথে সাথে মনে পড়লো অনেক স্মৃতি।  আমি তাঁর ‘হার্লেমের নিগ্রো আমি’ অথবা ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ গ্রন্থের প্রকাশক। এই মুহূর্তে মনে করতে পারছিনা।

তাঁর সংগ্রামী জীবন নিয়ে আমার একটি শর্ট ফিল্ম নির্মাণের কথা ছিলো। তাঁর নিউ জার্সিস্থ বাড়িতে বসে আলোচনা করেছি। স্ক্রিপ্ট হয়েছিলো আংশিক ঢাকার ধানমন্ডির বাসায়। শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।

কাহিনীটা ছিলো একেবার তাঁর জীবন থেকে নেয়া- গল্পকেও হার মানানো জীবনালেখ্য। কুমিল্লার অজ পাড়া গাঁ চর্থা গ্রামের একদুরন্ত গ্রাম্য কিশোরী। গ্রাম্য শালিশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে ঘৃণা ছুঁড়ে দেন অর্থাৎ পাটখড়িতে আগুণ জ্বালিয়ে ছুঁড়ে মারেন পঞ্চায়েতের তথা ফতোয়াবাজিদের দিকে। সেজন্য তাঁকে ঝাঁড়ু পেটা করা হয়। বাবাও শাস্তি স্বরূপ বাড়ির সামনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন। রাতে মা সেই বাঁধন মুক্ত করে ছেড়ে দিলেন। বললেন, যা পালিয়ে যা। ট্রেনে চড়ে চলে এলেন ঢাকায়। শুরু হলো অন্যরকম এক বস্তিজীবন, কুলি-মজুরের জীবন, না-খেয়ে থাকার জীবন। এক ট্রাক ড্রাইভারের দয়া হলো। তাঁকে গ্রহণ করলেন পালককন্যা হিসেবে। কিছুদিন না যেতেই এক্সিডেন্টে মারা যান সেই আশ্রয়দাতা পিতা।

আবার অনিশ্চিত ছন্নছাড়া জীবন, এতিমখানার জীবন, বুয়ার জীবন, ইট ভাঙার কাজ। সংগ্রামী জীবন শুরু করেন রিক্সাচালকহিসেবে। তারপর হকার-জীবন। তাঁকে ৫ কপি ফ্রি ইত্তেফাক দেয়া হতো। তা টিকাটুলি থেকে হাঁটতে হাঁটতে এবং পত্রিকা বিতরণ করতে করতে ৩২ ধানমন্ডিতে যেতেন বঙ্গবন্ধুর কাছে পত্রিকা দিতে। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু তাঁকে সেলাই মেশিন দিতে চান। তখন তিনি আবেদন করলেন পাবলিক বাস চালানোর জন্য অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রথম মহিলা বাস ড্রাইভার হতে চাইলেন। তা সংবাদ শিরোনাম হলো।

এই সবের পাশাপাশি মন খারাপের কথাগুলো, কষ্টগুলো রোলকরা খাতার পাতায় লেখা শুরু করলেন। ছাপা হতে থাকলো কবিতা। ১৯৭০ সালে বেগম পত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘জীবনের স্টেশনে’ পদ্মা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়।

এলোমেলো জীবনের তাগিদে হঠাৎ একটা ছোট চাকরি হলো ইরান দূতবাসে। কাপড় ইস্ত্রি করা। সেখান থেকে অনেকটা ‘পাচার’ জীবনের মতো চলে যান ইরানে। শুরু হলো আরেক পরবাসী বহিমিয়ান জীবন। সেখান থেকে জার্মানে। জার্মান থেকে যাযাবরের মতো একদিন চড়ে বসলেন মাছ ধরা ট্রলারে। সেই জাহাজ চলতে থাকে অজানার দিকে। এভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রচন্ড শীত, বরফের সাথে জীবন-মরন লড়াই করে পৌঁছলেন বাহামার এক সৈকতে। সেখান থেকে এক লোক ঊদ্ধার করে স্ত্রীর ভয়ে গ্যারেজে লুকিয়ে রেখে পরদিন শহরে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এই কাহিনী ভয়াবহ কাহিনী।

সেই স্বশিক্ষিত আলেয়া ধীরে ধীরে দাঁড়ালেন নিজের পায়ে। কিন্তু তখন তিনি কিছুটা ক্লান্ত। সেই সাথে শরীরে বাসা বাঁধলো মরণব্যাধি ক্যান্সার। ইতোমধ্যে কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আর্থিক ভাবেও স্বচ্ছল হন। নিউ জার্সিতে একটি ফ্ল্যাট এবংআরেকটি বাড়ি করেন। ঢাকায় সম্ভবত গোড়ানে জমি কিনেন; ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট কিনে ভাই-বোনদের দেন। অবিবাহিত আলেয়ার স্বপ্ন ছিলো একটি সংসারের। কিন্তু তা আর হলো না। ইতোমধ্যে প্রকাশ পায় তাঁর ইংরেজি-বাংলা কবিতা বই। আমি তাঁর একটি বইয়ের প্রকাশক।

নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন জনের ফেইসবুকে থেকে জানতে পারলাম, জীবনযুদ্ধে হেরে গেলেন তিনি। আজ বিকেলে আলেয়ার মরদেহ তাঁর বাসভবনের বাথরুম থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে। আমি এই সংগ্রামী কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।”

প্রখ্যাত লেখক, প্রকাশক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত ।

রূপশ্রী/এমএস