রূপশ্রী প্রতিবেদন
সোমবার, ৩ আগষ্ট, ঢাকা: রঙ ও গন্ধ বাঙালী নারী ও পুরষের পছন্দের বিষয়। বিষয়টি মাথায় রেখেই নানা রঙ ও সুগন্ধি মিশ্রিত হ্যান্ডরাব, সেনিটাইজার বাজারজাত করছেন অনেক বিখ্যাত কোম্পানী থেকে অখ্যাত, এমনকি ভুইফোড় ব্যবসায়ীরা। রাস্তার ফুটপাত থেকে মুদি দোকান এখন সয়লাব। করেনা মহামারির প্রতিষেধক নেই। এটাই এখন একমাত্র প্রতিরোধক। তাই এসবের চাহিদা যেমনে বেড়েছে। তেমনি বেড়েছে উৎপাদন ও জোগান।
বিশ্বে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর গত পাঁচ মাস ধরে মানুষের জীবণধারা বদলে গেছে। জীবণ বাঁচাতে মানুষ চলছে এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেখানো পথে। করোনা থেকে সুরক্ষায় ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার ও ঘন ঘন হাত ধূয়ে বা হ্যান্ডরাব ব্যবহার করে সেনিটাইজ বা জীবাণুমুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে তারা। বিকল্প হিসেবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলা হলেও মানুষের আগ্রহ বেশি হ্যান্ডরাব ও হ্যান্ড সেনিটাইজারের দিকে। বিশ্বে বিভিন্ন দেশে পানির সংকটের কারণে মানুষ হ্যান্ডরাব ও সেনিটাইজার ব্যবহার করছে বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে সাবান ও পানির সংকট না থাকলেও হ্যান্ড সেনিটাইজার ব্যবহারের আগ্রহ বেড়েছে। ফলে বেড়েছে এর চাহিদা। বেড়েছে দাম। বাজারে নামকরা প্রতিষ্ঠানের তৈরি হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার বিক্রি হচ্ছে বেশ চড়ামূল্যে। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে মাঠে নেমে পড়েছে। চাহিদার ঘাটতি মেটাতে ব্যাপকভাবে উৎপাদন ও কম দামে বাজারজাত করার কৌশল নিয়েছে নকল হ্যান্ডরার ও সেনিটাইজার ব্যবসায়ীরা। সুযোগ নিচ্ছে এসবের ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা ও সুগন্ধি প্রিয়তার।
অধিকাংশ হ্যান্ডরার ও সেনিটাইজার ব্যবহারকারীরা জানে না এর উৎপাদনের বিধি নিষেধের কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় হ্যান্ডরার ও সেনিটাইজার উৎপাদনের বিষয়ে বলা হয়েছে, হ্যান্ডরাব ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরিতে শতকরা ৭৫ ভাগ আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল (আইপিএ) অথবা শতকরা ৮০ ভাগ ইথানল থাকতে হবে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, হ্যান্ডরাব ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারে কোনো সুগন্ধি মেশানো যাবে না। কারণ সুগন্ধি বা পারফিউম ও রঙ মেশানো হলে তাতে অনেকের মাঝে অ্যালার্জির উদ্রেক ঘটাবে। এতে অনেকে অ্যালার্জির সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। আর অ্যালার্জি শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দিতে মূল ভূমিকা পালন করে। আর করোনার রোগের প্রধান সমস্যা শ্বাস কষ্ট।
অথচ করোনাকে পুঁজি করে মুনাফা লোভী কারবারিরা হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজারকে আকর্ষণীয় করতে নানা ধরনের রঙ ছাড়াও সুগন্ধি মেশিয়ে দেদারছে বাজারজাত করছে। ফলে এসব মানহীন সুরক্ষাপণ্য কিনে ও ব্যবহার করে মারাত্মক করোনা ঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। আবার অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠানের তৈরি আসল হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজারের লেবেলে ব্যবহারবিধি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেকে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি রাজধানীর হাতিরপুলের নিজ বাসায় হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে আগুন লেগে দগ্ধ হন চিকিৎসক দম্পতি। পরে গত ২৮ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চিকিৎসক ডা. রাজিব ভট্টাচার্য।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে আরেক কাহিনী। অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশের বাজারে চলমান অধিকাংশ হ্যান্ডরাব বা হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৭৫ ভাগ আইপিএ বা শতকরা ৮০ ভাগ ইথানল উপাদান বিদ্যমান নেই। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইপিএ বা ইথানলের পরিবর্তে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে যেনতেন ভাবে এসব পণ্য তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অনেকে জানেইনা হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার ব্যবহারের পর আগুনের কাছে যাওয়া যাবে না। আর নকলের ক্ষেত্রে তো ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।
এছাড়া দেখা গেছে অনেক নামী কোম্পানির প্রস্তুত করা এসব পণ্যের লেবেলেও ৭৫ ভাগ আইপিএ বা ৮০ ভাগ ইথানল উপাদান থাকার কথা উল্লেখ নেই। ইথানল থাকেল ব্যবহারের সময় হাতে শিরশির ঠান্ডা অনুভব হবে।
নকল মাস্ক ও পিপিই কেলেঙ্কারির মধ্যেই র্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়ন র্যাব ও পুলিশের অভিযানের পর এবার বেরিয়ে আসছে নকল ও মানহীন হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজারে নানা কাহিনী। আটক হচ্ছে অননুমোদিতভাবে বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা নকল ও মানহীন জীবাণুনাশক এসব পণ্য।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া গাইডলাইন বা বিধিবদ্ধ নির্দেশিকা মেনে তৈরি হচ্ছে না মানসম্পন্ন হ্যান্ডরাব ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার। তাদের মতে, নামীদামি, খ্যাত ও অখ্যাত কোনো প্রতিষ্ঠানই এসব সুরক্ষাপণ্য তৈরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধিবদ্ধ নির্দেশিকা অনুসরণ করছে না।
ইসলামি ব্যাংক মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. চিন্ময় দাস বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করেই হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার প্রস্তত ও বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। গাইড লাইন অনুসরণ করে নিবন্ধিত কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানগুলোও এসব পণ্য তৈর করছে কি-না, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর বলছে, নিয়মিত অভিযান চলছে। প্রাতিষ্ঠানিক অভিযানের পাশাপাশি র্যাব, পুলিশ, এনএসআই, ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব নকল জীবাণুনাশক পণ্য তৈরি, বিক্রি, মজুত বন্ধে তৎপর রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
এরমধ্যে নকল হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজারের বিরুদ্ধে শতাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশের এলিট ফোর্স র্যাব । এ ব্যাপারে র্যাব-৩ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু গণমাধ্যমকে বলেন, নকল হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার যাতে তৈরি ও বাজারজাতকরণ না হয় সেটি দেখার মূল দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের। ফুটপাত বা দোকানে বিক্রি ঠেকানোটাই মূল কাজ নয়। এগুলো তৈরি, মজুত ও বাজারজাতকরণ বন্ধই আমাদের টার্গেট। সেজন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা ডেমরা, মিটফোর্ড, আগারগাঁও, মহাখালী, শ্যামলীসহ বিভিন্ন স্থানে কারখানা বা গুদামে অভিযান পরিচালনা করেছি। বিপুল পরিমাণ নকল হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার জব্দসহ কারখানা সিলগালা করেছি। এটি আমাদের অব্যাহত থাকবে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার তৈরিতে ৭০টি প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত। যদিও এটি চলমান প্রক্রিয়া। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এটি তৈরি, বিক্রি কিংবা মজুত করতে পারবে না। বাজারে নকল হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার যাতে বিক্রি না হয় সেজন্য আমরা কাজ করছি। গণমাধ্যমে এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি, প্রচার-প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, মানসম্পন্ন হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার ব্যবহারেও দরকার সচেতনতা। যেমন- মুখে, চোখে, নাকে লাগানো যাবে না। ব্যবহারের পর আগুনের কাছে যাওয়া যাবে না। আর নকলের ক্ষেত্রে তো ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।
#
রূপশ্রী/প্রতিবেদন/সাবধান/এইচবি







