এমন ঈদ দেখেছে কী কেউ আগে?

1061

সুরাইয়া তাসনীম

ঈদুল ফিতরে ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশসহ মুসলিমবিশ্ব ভিন্নধর্মী এক ঈদ উদযাপন করেছে এবার। এমন ঈদ দেখেছে কী কেউ আগে? ঈদগায় না গিয়ে ঘরে, বাসার ছাদে বা মসজিদে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়, তা-ও আবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরে দূরে দাঁড়িয়ে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে। দেশে দেশে এবার এমনই উদযাপন করছেন মুসলমানরা। ঈদের নামাজ শেষে কোন কোলাকুলি নেই, হাতে হাত মিলানো নেই, কোন শুভেচ্ছা বিনিময় নেই, আত্মীয় বাড়িতে বেড়ানো নেই, ঈদি নেই, উচ্ছাস নেই, নেই কোন ঈদ আনন্দ। তারই মাঝে গত সোমবার বাংলাদেশেও উদযাপিত হয়েছে মুসলমানদের সর্ববৃহৎসধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর।

এবারের ঈদ উযাপন নিয়ে ঢাকার শান্তিনগরের বাসিন্দা নাসরীন সুলতানা বলেন, এ কেমন ঈদরে মা! ঘরে ঈদের নামাজ, ফ্ল্যাটের ছাদে ঈদ নামাজ। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাবস। জেলখানার কয়েদিদের মতো সাঁরি বেঁধে মসজিদে ঢোকা-এক ভীতিকর ঈদ। মনে হচ্ছে না কোন ঈদ কাটাচ্ছি। বাচ্চারা কোথাও যেতে পারছে না। আত্মীয়রা আসতে পারছে না। সব ঈদেই দুপুরে বাচ্চারা খেয়েছে ওদের ফুপ্পির বাসায়, রাতে সবাই খেয়েছে আমাদের  বাসায়। ঈদে আত্মীয়-স্বজনদের আগমনে উৎসব মুখর হয়ে উঠতো সবগুলো পরিবার। এবার কেউ আসেনি। কারো বাসায় যাওয়াও হয়নি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে যেন অন্যসব দিনের মতোই আজকেও একটা দিন কাটাচ্ছি গৃহবন্দি। তারপরও অভ্যাসমতো ঈদের ফিরনি, পোলাও, জর্দা, লাচ্ছা, সেমাই, গরুর কালিয়া, মুরগীর কোরমা রান্না করেছি। কিন্তু খাওয়ার লোক নেই। আমরা দু’জন তো খেতে পারি না। দু’মেয়ে আর কী খাবে? ওদের বন্ধুরা আসতো, এবার মোবাইলেই শুভেচ্ছা বিনিময় শেষ। এমন ঈদের গল্প দাদি-নানীর কাছেও শুনিনি, ইতিহাসেও পড়িনি, বলছিলেন নাসরীন সুলাতান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসরামের ইতিহাসে মাস্টার্স করা গৃহীনি।

সবার পরিবারের ঈদ উদযাপনের গল্পটা প্রায় একই রকম। বাংলাদেশে এই বছর ভিন্ন ধরনের এক ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে।

লকডাউনে উদযাপিত এবারের ঈদে সমাজের বঞ্চিত মানুষের হাহাকার ছিল সবচে’ বেশি। মসজিদের সামনে ভিড় ছিল না ভিক্ষুকদের। তবে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো রাস্তায়, কেউ একজন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে পকেটে হাত দিলেই হামলে পড়েছে তার। চারপাশে জমে উঠেছে ভিড়। এটা এক নিদারুণ হাহাকারের চিত্র।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে  এসেছে  এমনি আরেক চিত্র। সেখানে তুলে ধরা হয়েছে নিরাপত্তাকর্মীদের ঈদ হাহাকারের চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘করোনার বন্ধের মধ্যে ঢাকা নিউমার্কেটের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত আছেন ৩০ জন কর্মী। মার্কেটের ভেতরেই তাদের থাকা-খাওয়ার আলাদা ব্যবস্থা আছে। তবে মার্কেট বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এবার কোন বকশিশ পাননি বলে জানান দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মী। তিনি বলেন, এবার ঈদে দেখতেছি একদম হাহাকারের মতো। কারও ভেতরে কোনও শান্তি নাই, মজা নাই। আমরা এখানে ৩০-৩৫ জন দারোয়ান আছি। মার্কেট খোলা থাকলে আমরা মোটামুটি ভালো থাকতাম। ব্যবসায়ীরা মার্কেটে আসলে সালাম দিলেও ২০-৫০ টাকা সালামি দিয়ে যায়। এবার তো কিছুই নাই।’

‘নিউমার্কেট থেকে একটু সামনে এগিয়ে গেলে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট। এই মার্কেটের গেট বন্ধ করে ভেতরেই দায়িত্ব পালন করছেন ২২ জন নিরাপত্তাকর্মী। গেটের বাইরে দু’জন বসে মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী আব্দুর রবের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটাচ্ছিলেন। আবুর রব জানান, এবার মার্কেট বন্ধ থাকায় বেতন হলেও বোনাস হয়নি। এছাড়া দোকান খোলা থাকলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বকশিশ পাওয়া যেতো, এবার তাও জুটেনি।’

তবে লকডাউনের মধ্যেও বাসায় বাসায় যারা কাজ করতে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তারা কিছুটা ভাগ্যবান। কারণ কিছুটা হলেও তারা সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছেন। মোটামোটি একটা ঈদ করতে পেরেছেন।

প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে বিপর্যস্থ বাংলাদেশে সরকারের নির্দেশনায় এবার রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহসহ দেশের কোন ঈদগাহে বা খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি। এমনকি অনেকে মসজিদে না গিয়ে ঘরেই আদায় করেছেন ঈদের সালাত। অনেক ভবনের ছাদে সামাজিক দুরত্ব বাজায় রেখে ঈদের জামাতের আয়োজন করতে দেখা গেছে। ঈদকে ঘিরে যে সামাজিক আনন্দ-উচ্ছাস থাকার কথা এবার তা ম্লান করে দিয়েছে মহামারী করোনাভাইরাস।

গত সোমবার রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ বঙ্গভবনের দরবার হলে পরিবারের সদস্য ও সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন। সাধারণত তিনি জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করে থাকেন। এবার রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি। শত বছরের ঐতিহ্য ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানের ঈদ জামাতও এবার অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ঈদের ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যেকটি জামাতেই মসজিদে মুসল্লিদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। অনেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। নামাজ শেষে কেরোনার গজব থেকে মুক্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। প্রতিটি জামাত ও খুতবাহ শেষে মুনাজাতের সময় আবেগে আপ্লুত মুসল্লিরা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ক্ষমা ও সাহায্য প্রার্থণা করেন। করোনা দূর করে স্বাভাবিক জীবনের জন্য আল্লাহর কাছে আর্জি জানান তারা। মুনাজাতে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ কামনা করা হয়। এছাড়া দেশে ও বিশ্বে করোনায় আক্রান্তদের আরোগ্য কামনা করে দোয়া করা হয়। তবে এবার ঈদের নামাজ শেষে মুসল্লিদের কোলাকুলি ও হাত মেলানোর চিরাচরিত চিত্রটি দেখা যায়নি কোথাও। নামাজ শেষে যে যার মতো আনমনে বেরিয়ে গেছেন নিজেদের গন্তব্যে । ঈদের পর আত্মীয় পরিজনের বাসায় যাওয়া, ঈদি দেয়া নেয়া বা ঈদ আপ্যায়নের  চিরাচরিত কোন আমেজ এই ঈদে লক্ষ্য করা যায়নি। ইসলামের ইতিহাসে কবে কোথায় এমন ঈদ উদযাপিত হয়েছে, তা ইতিহাসবিদরা বলতে পারবেন।

এছাড়া করোনা পরিস্থিতির কারণে ঈদ উপলক্ষ্যে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় ও গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ে এবার কোন অনুষ্ঠান হয়নি। তবে রাষ্ট্রপতি ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বঙ্গভবনের দরবার হলে থেকে ঈদের নামাজ শেষে ভার্চ্যুয়াল শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঈদের আগের দিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন ও দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। ঈদের দিন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডে (মুক্তিযাদ্ধা টাওয়ার-১) শহীদ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে বসবাসরত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ফুল, ফল ও মিষ্টি পাঠান। দেশের সকল মুক্তিযোদ্ধাকে শুভেচ্ছা জানান।

রূপশ্রী/এইচ