ঈদ নামের গন্ধ

928

মনিজা রহমান

ঈদ নামের সঙ্গে একটা গন্ধ লেগে আছে। যখনই ঈদ আসে, রোজার ত্রিশ দিন শেষ হয়, চাঁন রাতে টেলিভিশনে বাজে অতি চেনা সেই গান- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে.. এল খুশীর ঈদ’ – তখনই গন্ধটা নাকে এসে লাগে। আর মনটা কখনও উদাস, কখনও অতি আবেগে থরথর, কখনো আনন্দে ভরপুর, আবার কখনও বিষাদগ্রস্ত হয়ে যায়!

ছোটবেলায় আমার কাকা-মামাদের অনেকে বিদেশে থাকতেন। তারা বাংলাদেশে আসার সময় লাক্স সাবান নিয়ে আসতেন স্যুটকেস ভরে। সব আত্নীয় স্বজনদের ভাগ করে দেবার পরে প্রত্যেকে হয়ত ২/৩ টা সাবান পেত। আমরা সেই সাবান তুলে রাখতাম ঈদের দিন ব্যবহার করার জন্য। অচেনা সুগন্ধীর সেই সাবানটা খোলা হত ঈদের দিন সকালে। সবাই সেটা দিয়ে গোসল করতাম। বেশী সুন্দর বলে সাবানের প্যাকেটটাও আমরা ফেলে দিতাম না। ঈদের নাম শুনলে শৈশবের সেই সুগন্ধী সাবানের গন্ধটা এসে নাকে লাগে। আর মস্তিস্কের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দময় অনুভূতি।

শুধু সাবান না, বিদেশ থেকে আসা বিছানার চাদর, টেবিল ক্লথ কিংবা কুশন কাভারও আমরা তুলে রাখতাম ঈদের দিনের জন্য। আলমারির তাকে ন্যাপথলিন দিয়ে রাখা হত সব কিছু। ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আগে ঘর গুছাতাম। ন্যাপথলিনের গন্ধটা অদ্ভুত ভালো লাগতো। এত সুন্দর দেখতে, এত সুন্দর গন্ধ তখন ইচ্ছে করতো ন্যাপথলিনটা খেয়েই ফেলি।

আমার ছোট বোন মারুফার যখন জন্ম হল, তখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। ঈদের দিন ভোরে ওর জন্ম হয়েছিল। আম্মা অসুস্থ, বোনের সন্তান হওয়া উপলক্ষে আসা ছোট খালা রান্না বান্নায় ব্যস্ত, ঘর গোছাবে কে ? আম্মা শুয়ে শুয়ে আমাকে বলতে থাকেন, কোথায় কি আছে. কিভাবে ঘর গোছাতে হবে, আমি সেভাবে ঘর গোছাই। স্কুলে ভর্তি হবার পরে প্রথম ঈদ, আমার সব স্কুল বান্ধবীরা বেড়াতে আসবে, ঘর দোর সুন্দর না দেখালে কি মান সম্মান থাকবে! আমি কচি হাতে ঘর গোছাই আর আমার আম্মা শুয়ে শুয়ে দেখে আর হাসে। বান্ধবীরা যখন এল, তখন আমার অতি ফর্সা আর বড় বড় চোখের সদ্যজাত বোনকে দেখে তো খুব অবাক! স্মৃতির জানালায় যখন তাকাই, ঈদ নিয়ে আর কোন দূরের ঘটনা মনে পড়ে না।

ছোটবেলায় ঈদের দিন আমার কখনই আনন্দমেলা দেখা হত না। ঈদের আনন্দমেলা শুরু হত রাত সাড়ে দশটার পরে। ততক্ষণে আমি ঘুমিয়ে কাঁদা হয়ে যেতাম। পরদিন সকালে উঠে যে কত আফসোস হত। তখন ঈদের আনন্দমেলা হত সেই রকম। এক ঈদের আনন্দমেলার গল্প পরের ঈদ আসা পর্যন্ত চলতো। আমার আব্বা পাড়া প্রতিবেশীরা আসলে সেই গল্প করতেন জমিয়ে। ইংল্যান্ডের প্যান্ট পরা আতাউল্লা কিংবা রবিউলের হুমকিতে ইনক্রিডেবল হাল্কের চলে যাওয়া – রসিয়ে রসিয়ে বলা হত। ঈদের দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি বান্ধবীদের সঙ্গে পাড়া ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। সালামির টাকা দিয়ে একটার পর একটা আইসক্রিম কিনে খেতাম। দুধের ওপর নারকেল দেওয়া সেই আইসক্রিমের গন্ধটাও পাই ঈদ আসলে।

ঈদের দিনে আমার প্রিয় খাবার ছিল আম্মার রান্না করা পোলাও আর মুরগির কোর্মা। আমাদের শৈশবে পোলাও-কোর্মা খাওয়া ছিল বিরল ঘটনা। সাধারণত ঈদ আর বাসায় মেহমান এলে এটা রান্না হত। তবে ঈদের দিন যত ইচ্ছেমত খাওয়া যেত, অন্য সময় সেই সুযোগ ছিল না। আমার আম্মা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রতি ঈদের দিন সকালে মুরগির কোর্মা রান্না করতেন। বরিশাল থেকে আমাদের ঢাকার বাসায় সব সময় নারকেল আসতো। মুরগীর কোর্মায় সেই নারকেল বেটে, তারপর ছেকে দুধটা দিতেন, যে কারণে আলাদা একটা গন্ধ হত। ঈদ আসলে সেই গন্ধটা নাকে এসে লাগে।

নিউইয়র্কে এসে জ্যাকসন হাইটসের চাঁন রাত উদযাপন দেখে মুগ্ধ হবার পাশাপাশি স্মৃতিকাতর হই- শৈশবের চাঁন রাতের কথা ভেবে। ঈদ হোক আর দুর্গা পুজা হোক, পুরান ঢাকার মতো এত সরগরম কোথাও পাওয়া যায় না। গেন্ডারিয়ার কাঠের পোলের আগে চাঁন রাতের বাজার বসতো। নিম্নবিত্তরা আসতো কাপড়, স্যান্ডেল কিনতে। বেশীরভাগ বের হত শেষ মুহূর্তের মাংস, পোলাও চাল, ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই, গরম মশল্লা, ঘি, কিসমিস ইত্যাদি কিনতে। চারদিকে মানুষের মধ্যে আসন্ন উৎসবের থরথর উত্তেজনা। রাস্তার দুই পাশে কেরোসিনের কুপি নিয়ে বসে থাকতেন লেইস ফিতাওয়ালারা। আমরা তাদের কাছ থেকে চূড়ি-ফিতা কিনতাম।

ঈদে এলে কেরোসিনার শিখার মতো দেয়ালে দুলতে থাকে আমার শৈশব, বহুদূর থেকে যার গন্ধ এসে নাকে লাগে।

সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।

*মনিজা রহমান, কবি, কথাশিল্পী ও সাংবাদিক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক প্রবাসী। তার ফেসবুক পোস্ট থেকে