দেশজুড়ে সমাবেশ; ধর্ষকদের প্রতি পুলিশের কঠোর হুঁশিয়ারি

902

রূপশ্রী প্রতিবেদন

১৮ অক্টোবর, ঢাকাঃ

বাংলাদেশ পুলিশের উদ্যোগে এই প্রথম ঢাকাসহ সারাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী প্রায় ৬,৯১২টি সমাবেশ হয়েছে ৷ সেখানে পুলিশ কর্মকর্তারা ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ৷ গত শনিবার ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যাকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‌’নজিরবিহীন‌’ বলে বর্ণনা করেছে।

বাংলাদেশে পুলিশের মোট ৬৪৭টি থানা আছে ৷ এই থানাগুলোতে পুলিশের মোট বিট ছয় হাজার ৯১২টি ৷ পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, সবগুলো বিটেই শনিবার ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী সমাবেশ হয়েছে ৷ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে অনুষ্ঠিত সমাবেশগুলোতে ধর্ষণের বিরুদ্ধে নানা প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অনেকেই অংশ নেন ৷

এসব সমাবেশ থেকে ভুক্তভোগীদের নির্ভয়ে থানায় অভিযোগ করা আহ্বান জানানো হয়৷ সাধারণ মানুষ যেন ধর্ষকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং পুলিশকে ধর্ষণ প্রতিরোধে সহায়তা করেন, সে আহ্বানও জানানো হয় ৷

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের উপ-কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা সারাদেশে এই সমাবেশের আয়োজন করেছি একটি বার্তা দিতে, তা হল ধর্ষণ করে রেহাই পাওয়া যাবে না৷ ধর্ষককে শাস্তির আওতায় আসতেই হবে ।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ঢাকা শাহবাগ থানার সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি ৷ তিনি আরও বলেন, ‘‘ধর্ষণ এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ৷ মানুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে সচেতন হচ্ছে ৷ আমরা ধর্ষণের শিকার নারীদের পাশে আাছি ৷ আমাদের কথা হলো কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হবে না ৷ আর কোনো মায়ের সন্তান যেন ধর্ষক না হয় ৷”

এই সমাবেশে অংশ নেয়া রেহানা পারভীন বলেন, ‘‘ধর্ষণের শিকার যারা হন তারা ঠিকমত পুলিশের সহযোগিতা পান না৷ সহযোগিতা পেলে ধর্ষণ কমবে ৷” তার মতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করায় এখন ধর্ষকরা ভয় পাবে ৷ ফলে ধর্ষণ কমে আসবে ৷ তবে মানুষের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করেন তিনি ৷

সমাজের পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘‘আমরা তো আপনাদেরই মা-বোন-স্বজন ৷ আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন তাহলে ধর্ষকরা আর অপরাধ করতে সাহস পাবে না ৷”

সমাবেশে উপস্থিত খায়রুল আলম বলেন, ‘‘আমাদের নারীদের প্রতি সহনশীল হতে হবে ৷ তাদের শুভাকাঙ্খী হিসেবে পাশে থাকতে হবে ৷ তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে ৷ এই সমাজে তাদেরও সমান অধিকার এটা আমাদের মনে রাখতে হবে ৷”

এদিকে, পুলিশের দাবি ধর্ষণ বাড়েনি, বরং আগের থেকে সংবাদমাধ্যমে এর প্রচার বেশি হচ্ছে ৷ ডিএমপির রমনা জোনের উপ-কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘‘সংবাদ মাধ্যমে কখনো ছেলেধরা, কখনো গণপিটুনির রিপোর্ট বেশি হয়৷ ধর্ষণের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে ৷ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে যখন আলোচনা হয় তখনই আমরা সক্রিয় হই এই অভিযোগও ঠিক নয়, আমরা সব সময় সক্রিয় আছি ৷”

ধর্ষণ মামলায় তাহলে শাস্তির হার এত কম (শতকরা ৩-৪ ভাগ) কেন? তদন্তে ত্রুটি আছে কিনা এসব প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের তদন্তে ত্রুটি আছে বলে মনে হয় না ৷ শাস্তি আদালতের বিষয় ৷ কেন হয় না আদালতই বলতে পারবেন ৷”

পুলিশের উদ্যোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের থানা এলাকায়ও ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ হয়েছে ৷ ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের চারটি ইউনিয়নে চারটি সমাবেশ হয়েছে ৷ এই থানার ইন্সপেক্টর নাজনীন খানম বাংলাদেশের থানাগুলোতে যে কয়জন হাতে গোনা নারী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আছেন তাদের একজন ৷ ওসি নাজনীন খানম বলেন, ‘‘সমাবেশে আমরা সবাইকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে তাদের ভয় নেই৷ আমরা পাশে আছি৷ ধর্ষককে আমরা ছাড়বো না৷”

তবে তিনি মনে করেন, ধর্ষণ সারাদেশে বাড়েনি ৷ বেড়েছে কিছু এলাকায়৷ তিনি দাবি করেন, ধর্ষণের শিকার নারীদের থানা থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা করা হয় ৷ তাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হয় ৷ তিনি বলেন, ‘‘ধর্ষণ মামলায় বিচার হয় না কেন তা যারা বিচার করেন তারাই বলতে পারবেন৷ আমরা বলতে পারবনা ৷”

তিনি যোগ করেন, ‘‘আমার থানা এলাকায় আমি নারী ওসি হওয়ার কারণে তাদের সাথে সরাসরি কথা বলি৷ তারা সবকিছু আমাকে খুলে বলেন, তাদেরও সুবিধা হয়, আমারও বুঝতে সুবিধা হয়৷ এই ধরনের ব্যবস্থা বাড়ানো যেতে পারে৷” পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এই ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

প্রসঙ্গত পুলিশের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৫,৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩,৯০০টি।

রূপশ্রী/ টি আর