অনলাইন গরুর হাটে নারী উদ্যোক্তার সাফল্য

1379

রূপশ্রী প্রতিবেদন

২৭ জুলাই, ঢাকা :

‘যে রাধে সে চুল ও বাঁধে’ কথাটির ব্যাপ্তি আজ আর শুধু রান্নাঘরে নেই। যে রাঁধে সে এখন আকাশেও উড়ে। তবে নারী যে গরুর বেপারী হিসাবেও সফল হতে পারে তা অনেকের ভাবনায় ছিল না। এবার কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে অনলাইনে গরুর হাট দিয়ে দারুন সাড়া ফেলেছেন রাজিয়া হক কনক, ‘বাজিমাত‘এর অন্যতম কো-ফাউন্ডার। একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অনলাইন গরুর হাটের উদ্যোগ এবং কাজ করতে গিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা জানতে রূপশ্রী থেকে আমরা রাজিয়া হক কনকের সাথে কথা বলি।

অনলাইন ই কমার্স পেজ ‘বাজিমাত’এর জন্ম চার বছর আগে। করোনাকালীন সময়ে তাদের অনলাইন কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি পায়। তরুণ ব্যবসায়ী ও ইয়ুথ এক্টিভিস্ট সৈয়দ মাহমুদ মুসা বাজিমাত’এর ফাউন্ডার। কো-পার্টনার হিসেবে আছেন সফল ইভেন্ট প্ল্যানার ও নারী উদ্যোক্তা রাজিয়া হক কনক এবং চিকিৎসক ও উদ্যোক্তা ডা. সৈয়দ মুহাম্মদ মুসা। কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে বাজিমাত অনলাইন গরুর হাট আয়োজন ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।

প্রথমেই কনকের কাছে জানতে চাইলাম গরু নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সবার কাছ থেকে কেমন রেসপন্স পান। কনক বলেন, ‘সবাই অনেক মোটিভেট করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। আব্বু তো প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। প্রথম দিন যখন আমি আব্বুকে বলি, আব্বু গরু লাগবে? আব্বু তো বিশ্বাসই করে না। বলে, ফাজলামি করবি না, আমাকে বোকা বানাস। তিনদিন পরে মোবাইলে গরুর ছবি দেখে আব্বু বিশ্বাস করেছে।’

‘এখনতো আমার নাম গরুওয়ালী হয়ে গেছে। আমাকে বেপারি কনক, গরুওয়ালী নামে ডাকে সবাই।’ হাসতে হাসতে বললেন কনক। তার ভাষ্যমতে, ‘জীবনে কোনদিন কল্পনাও করিনি কোরবানীর গরু-খাসি অনলাইনে বেচা-কেনা করবো। আজকে আমি এবং আমার কো-পার্টনাররা এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি সব আল্লাহর ইচ্ছা। সবার থেকে যে সাপোর্ট অনুপ্রেরণা পাচ্ছি তা মূল্যহীন।’

গরু সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য নিয়মিত অনেক ফোন আসে। কনক সেসব ফোন রিসিভ করেন। অনেক প্রবীণ মানুষ ফোনে কনকের কন্ঠ শুনে প্রথমে হতবাক হয়ে যান। কনক বলেন, ‘একদিন একজন আংকেল ফোন দিয়ে আমার ভয়েস শুনে বললেন, আমি কি ভুল নাম্বারে ফোন দিলাম? এটা কি পারসোনাল নাম্বার ? আসলে আমি তো গরু কেনার জন্য ফোন দিয়েছিলাম। তখন আমি বললাম, আংকেল আপনি ঠিক জায়গায় ফোন দিয়েছেন। বলেন কি ইনফরমেশন লাগবে। দিন তো বদলেছে তাইনা !’

অনলাইন গরুর হাটের আইডিয়া কিভাবে আসলো, কিভাবে শুরু করেছেন, কোথা থেকে গরু আনছেন এসব প্রশ্নের উত্তরে কনক বলেন, ‘আইডিয়াটা মূলত আমার পার্টনার, বাজিমাত’এর ফাউন্ডার সৈয়দ মাহমুদ মুসা’র মাথা থেকে আসে। তিনি প্রথম উদ্যোগটার কথা ভাবেন। এরপর আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করি। সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে প্রথমে আমরা কয়েকটা টিম ভাগ করি। আমি কিভাবে কাজ করলে পুরা উদ্যোগটা সফল হবে সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু করি, কাজের ছক করি, প্ল্যান করি সবকিছুর। ‘

কনক বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ দেশি গরু নিয়ে কাজ করছি। দেশি ফার্ম এবং দেশি খামারিদের থেকে আমরা গরু নেই। প্রথমে নীলফামারীতে আমরা একটা টিম পাঠাই। তারা তিন দিন সেখানে থেকে বিভিন্ন খামারি এবং এগ্রো ফার্ম-এর সাথে কথা বলে । আমরা প্রথমে তাদের দাম এবং তাদের চাহিদা সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। সব সময় চেয়েছি খামারিরা যাতে তাদের ন্যায্যমূল্য পায়। তাই কখনো আমরা দামাদামি করিনি। খামারিরা যেই দাম চেয়েছে সেই দামেই কিনেছি। তবে আমরা একসাথে অনেকগুলি গরু কিনায় খামারিরা আমাদের সেই ভাবে দাম ধরে দিয়েছে। প্রথম তিন দিনে নীলফামারী থেকে ২৬ টা গরু কিনে আমাদের অনলাইন গরুর হাটের যাত্রা শুরু হয়।’

‘যেদিন আমরা গরু কিনি সেদিন থেকেই আমরা বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে গরুর ছবি তুলে, ভিডিও করে অনলাইনে আপলোড করি। প্রথম দিন থেকেই আমরা বেশ ভালো সাড়া পাই, এতে আমাদের কাজের প্রতি আরো উৎসাহ আসে । ক্লায়েন্টরা ছবি, ভিডিও দেখে আগ্রহী হয় এবং আরো ডিটেইলস জানতে চায়। আমরা তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেই। সব জেনে এরপর তারা তাদের অর্ডার কনফার্ম করে। আমরা সব গরু ঈদের আগে হোম ডেলিভারি করার সিস্টেম রেখেছি।’

‘এরপর আমাদের দ্বিতীয় টিম যায় শেরপুরে , সেখান থেকে আমরা ১৬ টা গরু কিনি। ঐ গরুগুলি আমরা ঢাকায় নিয়ে আসি। প্রথম দুই দিনে সাতটা গরু বিক্রি হয়ে যায় । সেসময় আমরা আরো ভালো রেসপন্স পাই। এরপর আমাদের আরেক টিম যায় কুষ্টিয়াতে। সেখান থেকে আমরা গরুর ভিডিও ক্লিপ সংগ্রহ করে ফেসবুক পেজ’এ আপলোড করি। গত সপ্তাহে আমাদের টিম সিরাজগঞ্জ গরুর হাটে যায়। সেখান থেকে আরো বেশ কিছু গরু কিনে আনা হয়েছে । রেসপন্স ভালো পাওয়াতেই আমরা চার দফায় গরু কেনার সাহস পেয়েছি।’

‘আমরা সব ক্রেতার কাছ থেকে কনফারমেশন হিসেবে ২৫% এ্যাডভান্স নিচ্ছি। যাতে পরবর্তীতে কোন সমস্যা না হয়। ঈদেরআগে সবাই গরু যার যার বাসায় ডেলিভারি পাবেন। মূলত এই কনফারমেশন সিস্টেমের ফলেই আমরা নতুন করে আরো বিনিয়োগ করতে পেরেছি’, বলেন কনক।

‘আমরা সবাই কাজ ভাগ করে নিয়েছি। আমি হাটে যেতে পারিনি, অফিসের কাজগুলি করছি।’ ক্লায়েন্টদের সাথে কথা বলছেন কনক। ক্লায়েন্টদের সবার ফোন নেয়া, তাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। আলাদা একটি টিম গরু দেখাচ্ছে। আবার বুকিং, এ্যাডভান্স এসব হিসাব রাখতে করা হয়েছে আরেক টিম। প্রতিদিন নিয়মিত অনলাইনে ছবি, ভিডিও আপলোড দেয়া হচ্ছে।

কনক বলেন, ‘প্রবীণরা বেশির ভাগ সময় গরু দেখে কিনতে চায়। তাই আমরা তাদের জন্য সুযোগ রেখেছি যাতে তারা দেখে কিনতে পারে। যারা এসে গরু দেখতে চায়, তাদের গরু দেখাচ্ছি । যারা ভিডিও দেখতে চায় তাদের ভিডিও করে পাঠাচ্ছি। এভাবে আমরা চতুর্মুখী কাজ করছি।’

‘প্রথমবার উদ্যোগ নিয়ে আমরা যেহেতু ভালো সাড়া পাচ্ছি তাই আমরা খুশি এবং আশাবাদী। এমন সাড়া অব্যাহত থাকলে আমরা হয়ত আগামী বছরও অনলাইনে হাট দিব। আর এই প্লাটফর্মটা ভালো। করোনার এই সময়ে অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে আছে। এই হাটের ফলে অনেকে কাজের সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের স্টাফদের এখান থেকে একটা উপার্জন হচ্ছে।’

কনক যোগ করেন, ‘আরো একটি বিষয় বলতে চাই, আমরা কষাই সার্ভিস দিচ্ছি। গরু জবাই, গোস্ত প্রসেসিং, প্যাকিং করে আমরা গোস্ত বাসায় ডেলিভারি করে দিব। যারা আমাদের কাছ থেকে গরু কিনবেন চাইলে আমাদের কষাই সার্ভিস নিতে পারবেন।’

ভবিষ্যতের বাজিমাতের প্ল্যান জানতে চাইলে বলেন, ‘বাজিমাত নিয়ে আমরা আশাবাদী। নতুন নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আমরা সামনে আরো কাজ করতে চাই।’

রূপশ্রী/টিআর