হামাসকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাজা থেকে মুক্ত এক ইসরায়েলি জিম্মির মায়ের চিঠি

448

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ড্যানিয়েল অ্যালোনি ও তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে এমিলিয়া। ছবি: রয়টার্স/ এক্স এর সৌজন্যে

‘যদিও শিশুদের বন্দি করা উচিত নয়, তবু আপনাদের এবং এ দীর্ঘ সময়ে অন্যান্য আরও যেসব সদয় মানুষদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাদের ধন্যবাদ। আমার মেয়ে গাজায় রানির মতো থেকেছে। গাজায় আপনারা যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন এবং যে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তা সত্ত্বেও আপনাদের এমন সদয় আচরণ আমার মনে থাকবে।’
কথাগুলো গাজায় হামাসের হাতে অপহৃত ও জিম্মি হিসেবে থাকা এক শিশুর মায়ের।
গত ৭ অক্টোবর ইসরাইল থেকে অপহৃত ও জিম্মী নারী ও শিশুদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনের জেরুজালেম, গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে ইসরাইলের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী নারী ও শিশুদের বন্দী বিনিময় চলছে গত ছয়দিন ধরে। এর মধ্যে ৪৯ দিন পর মুক্তি পেয়ে গাজা ছাড়ার আগে তাদের অপহরণকারী হামাস যোদ্ধাদের ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লিখেছেন এক শিশুর মা। পাঁচ বছর বয়সী এমিলিয়া অ্যালোনি নামের শিশুর মা ড্যানিয়েল অ্যালোনি নিজেও হামাসের হাতে জিম্মি অবস্থায় ছিলেন।
অ্যালোনির চিঠিটি (২৭ নভেম্বর ২৩) হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসেম ব্রিগেডের অফিসিয়াল টেলিগ্রাম পেইজে পোস্ট করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। মূল চিঠিটি হিব্রু ভাষায় লেখা। টেলিগ্রামে প্রকাশ করার সময় চিঠিটির একটি আরবি অনুবাদসহ ইসরায়েলি ওই মা ও তার মেয়ের একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। ইসরায়েলি জিম্মিদের সঙ্গে হামাস যোদ্ধারা কেমন আচরণ করছে, তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে চিঠিটি প্রকাশিত হয়।

কাতারের আলজাজিরা, ইরানের প্রেস টিভি, তুরস্কের অনলাইন ইংরেজি সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড, লেবাননের আলমায়দিনসহ আরবি ও ইংরেজী ভাষায় বিষয়টি প্রতিবেদন হিসেবে তুলে ধরলে বিশ্বে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়।

চিঠিতে ড্যানিয়েল লিখেছেন, ‘আমার মেয়ে এমিলিয়ার প্রতি আপনাদের অসাধারণ মানবিক আচরণের জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
ইসরায়েলি ওই মা মেয়ের অনুভূতি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘ও (এমিলিয়া) আপনাদের সবাইকে ওর বন্ধু, শুধু বন্ধু নয়, প্রকৃতপক্ষেই ওর প্রিয় এবং খুব ভালো মানুষ মনে করে।’
চিঠিতে গাজায় জিম্মিদের সঙ্গে হামাসের ভালো আচরণ ও যত্ন নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন ড্যানিয়েল। তিনি লিখেছেন, ‘পরিচর্যাকারী হিসেবে আপনারা আমাদের পেছনে যে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন তার জন্য ধন্যবাদ।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘যদিও শিশুদের বন্দি করা উচিত নয়, তবু আপনাদের এবং এ দীর্ঘ সময়ে অন্যান্য আরও যেসব সদয় মানুষদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাদের ধন্যবাদ। আমার মেয়ে গাজায় রানির মতো থেকেছে।’
ডেনিয়েল আরও বলেন, এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের এমন কারও সঙ্গে দেখা হয়নি, যারা তার প্রতি সদয় ছিলেন না। আপনারা তার সঙ্গে কোমল এবং সহানুভূতিশীল ছিলেন।’

৭ অক্টোবর হামাসের হাতে জিম্মি হওয়া প্রায় ২৪০ জনের মধ্যে দুজন হলেন অ্যালোনি ও তার মেয়ে এমিলিয়া। হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ২৪ নভেম্বর অন্যান্য জিম্মিদের সঙ্গে তারা মুক্তি পেয়েছেন। জিম্মি হওয়ার আগে তারা দক্ষিণ ইসরায়েলের কিবুতজ-নির-ওজে ড্যানিয়েলের বোন এবং তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তারা অপহৃত ও জিম্মী হন।
এরপরও হামাসের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এমিলিয়ার মা লিখেছেন, ‘গাজায় আপনারা যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন এবং যে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তা সত্ত্বেও আপনাদের এমন সদয় আচরণ আমার মনে থাকবে।’
তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘এই পৃথিবীতে আমরা যদি সত্যিই ভালো বন্ধু হতে পারতাম!’
এরপর তিনি অপহরণকারী হামাস সদস্যদের কল্যাণ কামনা করে লিখেছেন, ‘আপনাদের সবার স্বাস্থ্য এবং মঙ্গল কামনা করছি…আপনাদের ও আপনাদের পরিবারের সন্তানদের জন্য সুস্বাস্থ্য কামনা ও ভালোবাসা।’

উল্লেখ্য, গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ ইসরায়েলে তাদের হামলার জবাবে গাজায় বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। হামাসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরায়েলি হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি বেসামরিক নিহত হয়েছে। যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। ইসরায়েলের গাজা আক্রমণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার ঝড় উঠলেও তা আমলে নেয়নি দেশটি। ইসরায়েলের দাবি, হামাসের হামলায় অন্তত ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন।