রূপশ্রী প্রতিবেদন (২৯ জুন), ঢাকা:
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা দেশের সকল নাগরিককে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেবো বলে ঘোষণা করেছি। এজন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য যত টাকাই প্রয়োজন হবে আমরা সেই টাকা দেবো। পর্যায়ক্রমে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। কোন ভ্যাকসিন কোন বয়স পর্যন্ত দেওয়া যাবে তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা বিবেচনায় রেখে আমরা স্কুল থেকে শুরু করে সকলে যাতে ভ্যাকসিন পায় সে ব্যবস্থা নিয়েছি। স্কুল থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষায় যারা আছে সবাই যেন ভ্যাকসিন পায় এবং দ্রুত যেন আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারি; সেই ব্যবস্থা নেবো। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের করোনা টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। টিকা কর্যক্রম সম্পন্ন হলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হবে। আর করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে।
স্পিকার ড. শিরীন শারিমন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
করোনা মোকাবিলা তার সরকারের কর্মকান্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যখন ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চলছিল তখনই পৃথিবীর সব জায়গায় আমরা যোগাযোগ করি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন দেওয়ার আগেই আমরা টাকা পাঠিয়ে ভ্যাকসিন বুকড করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য ভারতে হঠাৎ করোনা এতো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেল যে তারা ভ্যাকসিন এক্সপোর্ট করা বন্ধ করে দেওয়াতে সামগ্রিকভাবে কিছুটা সমস্যায় পড়ে গেছি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বর্তমানে আমাদের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন আর কোন সমস্যা হবে না। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সব কোম্পানির সাথে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। আশা করছি জুলাই মাস থেকে আরও ভ্যাকসিন আসবে। ব্যাপকভাবে ভ্যাকসিন প্রদান শুরু করবো।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ভ্যাকসিন কেনার জন্য বাজেটে আমরা ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছি। বিভিন্ন উৎস হতে ইতোমধ্যে এক কোটি ১৪ লাখ ৬ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করেছি। কোভিড-১৯ মহামারি দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিগত বাজেটের ন্যায় এ বাজেটেও স্বাস্থ্য খাতকে সার্বাধিক অগ্রধিকার দেওয়া হয়েছে। আমরা গত বছর মহামারির প্রথম ঢেউ সফলভাবে মোকাবিলা করেছি। এখন অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় ঢেউ রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। ফলে এই মহামারি মোকাবিলা করে জনস্বাস্থ্য জনজবীন সুরক্ষা করতে আমরা সক্ষম হব ইনশাল্লাহ।
এসময় বিদেশগামী কর্মীদের দেশেই ভ্যাকসিনের দু’টি ডোজ দেয়ার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের যে কর্মীরা বিদেশে যাচ্ছে তাদের ভ্যাকসিনটা আগে দিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। ফাইজারের যে ভ্যাকসিন আসছে ইতোমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি বিদেশে কর্মী যারা যাবে তাদেরকে দু’টি ডোজই দিয়ে দেওয়ার। যেন ওখানে গিয়ে তাদের কোয়ারেন্টাইন করতে না হয়, তার যেন সরাসরি কর্মস্থলে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করেছি।
সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এই খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রণোদনা প্রদান ও ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছি। বিগত বছর কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বিশেষায়িত আইসোলেশন ইউনিট, কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ল্যাবরেটরি কার্যক্রম ও কোভিড চিকিৎসার জন্য নতুন ডেডিকেটেড হাসপাতাল অর্ন্তভুক্তকরণসহ দেশব্যাপী সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য পরিকল্পনা খাতে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। তিনি আরো বলেন, করোনা মাহামারির দ্বিতীয় ঢেউ এখনো বিদ্যমান থাকায় মহামারি মোকাবিলায় যে কোন জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য আমরা এই বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা করেছি। দ্রুততম সময়ে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সেবা নিশ্চিত করতে ১০ হাজার ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও স্থাপন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যখাতের অর্জন টেকসই করা ও ভবিষতে মহামারি অভিঘাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল গঠন, কারণ আমাদের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা তেমন ছিল না। আমরা এবার সেটার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। সেই সমন্বিত স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান গবেষণা উন্নয়ন তহবিল গঠন করেছি। বাজেটে সেই তহবিলে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার শিক্ষাকে সব থেকে গুরুত্ব দেয়। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। ‘আমার গৃহ আমার স্কুল’, ‘ঘরে বসে শিখি’সহ সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে দূরশিক্ষণের কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ বেতার, কমিউনিটি রেডিও এবং অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। এতে করে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর দীর্ঘ একবছর শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা সম্ভবপর হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিরতণ করেছি এবং বৃত্তি, উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু না থাকায় শিক্ষার্থীদের খুবই কষ্ট হচ্ছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল মাদ্রাসা খুলে দেওয়া হবে।
এসময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ মতো ভ্যাকসিন দেওয়ার বয়সের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসে সারা বিশ্ব যখন ক্ষতিগ্রস্থ এমন সময় আমরা বাজেট দিয়েছি। একদিকে সারা বিশ্ব করোনায় আক্রান্ত, অপরদিকে আমাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি। একই সময় বাংলাদেশকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে পেরেছি। এই তিনটি গৌরবময় অধ্যায়ের মাঝে করোনায় জর্জরিত। তিনি বলেন, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব সত্ত্বেও সরকারের পদক্ষেপে আমাদের অর্থনীতি পূর্ণাঙ্গভাবে পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। আমাদের সরকার সংকটকালে দেশের মানুষের পাশে আছে। মানুষের পাশে থাকবে। জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, জীবন-জীবিকার সুরক্ষা দেওয়া এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কোন উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন হলে দ্রুতার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো। মানুষের পাশে আমরা দাঁড়াবো।
#
এসটি/আরএইচ







