মিথ নয়, রইদ মানুষের সহজাত আকাঙ্ক্ষার গল্প

7

সাদিকুর রহমান

ঢাকা (রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬): একটি ভালো সিনেমা কেমন হওয়া উচিত? এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। তবে তিনজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক ও শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।আমেরিকান সমালোচক রজার এবার্টের কাছে সিনেমা হলো সহানুভূতি তৈরি করার যন্ত্র। একটি ভালো সিনেমা দর্শককে আরেকজন মানুষের জীবন ও অনুভূতি উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। ফরাসি সমালোচক আঁদ্রে বাজাঁর মতে, ভালো সিনেমা বাস্তবতাকে এমনভাবে তুলে ধরে যাতে দর্শক নিজেই অর্থ খুঁজে নিতে পারে। আর নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী ফ্রাঁসোয়া ট্রুফোর দৃষ্টিতে পরিচালকের ব্যক্তিগত শিল্পদৃষ্টির প্রকাশই একটি চলচ্চিত্রকে বিশেষ করে তোলে।

রইদ দেখার পর মনে হয়েছে, পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন এসব সংজ্ঞা মেনেই সিনেমা বানিয়েছেন। এখানে সাদু (মোস্তাফিজুর নূর ইমরান) ও তাঁর বউয়ের (নাজিফা তুষি) জীবনকে দেখার যেমন সুযোগ আছে, তেমনি তাঁদের চরিত্রকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করারও অবকাশ পান একজন দর্শক। আর সুমন তাঁর ব্যক্তিগত শিল্পদৃষ্টির প্রয়োগ করে একটি সাধারণ ও পরিচিত গল্পকে বিশেষ করে তুলেছেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে, যে গল্পকে দর্শকরা অনেক জটিল বলে সমালোচনা করছেন সেটিকে ‘সাধারণ’ কেন বলছি? লালন ফকিরের উদ্ধৃতির মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর পরিচালক নিজেই দিয়েছেন। একেবারে সিনেমার শুরুতে। মূল গল্পে ঢোকার আগে পর্দায় ভেসে ওঠে লালনের একটি উক্তি- ‘মোহের ফাঁদে পড়ো না’। এখানে মোহকে আপনি তীব্র আকর্ষণ, আসক্তি কিংবা কোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত মায়া হিসেবেও ধরে নিতে পারেন। যেমন- সিনেমায় আমরা তালকে এই মোহের মাধ্যম হিসেবে দেখতে পাই। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে তাল এমন একটি ফল যেটির রস নেশা তৈরি করে। এই নেশায় বুঁদ হয়ে স্ত্রীর প্রতি সাদুর যৌন আকাঙ্ক্ষা প্রশমিত হয়, একইসঙ্গে মায়াও জন্মে।

খামখেয়ালি স্বভাবের (সিনেমায় পাগলি) কারণে যে স্ত্রীকে সাদু এক সময় ত্যাগ করার পরিকল্পনা করে, পরবর্তীতে সেই স্ত্রীর কোলে মাথা গুঁজে আপন করে নিতে চায়। নিজের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী বানাতে চায়। স্ত্রীর জন্য বানাতে চায় নিরাপদ আশ্রয় (ঘর)। যখন কাছে থাকে না, তখন স্ত্রীর বানানো তালের পিঠা কিংবা পোষা ছাগলের (কুলসুম) মাধ্যমে সঙ্গ খুঁজে নেয়। আপনজনের মৃত্যুর পর আমরা যেমন স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই, বিষয়টা ঠিক সে রকম।

সাদু, ‘পাগলি’ ও পাকা তাল
সিনেমায় সাদুর বউয়ের কোনো পারিবারিক নাম থাকে না। সবাই তাঁকে ‘সাদুর বউ’ বা ‘পাগলি’ নামে চেনে। যে ছোট বেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছে, বড় হয়েছে মামার বাড়িতে। কিশোর বয়সে তাঁর একবার বিয়েও হয়েছিল। সাদু তাঁর দ্বিতীয় স্বামী। সাদুর বউকে ‘পাগলি’ বলা হয়, কারণ সে সমাজের প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে আচরণ করে। অনেকটা সরল-সোজা স্বভাবের। বিভিন্ন দৃশ্যে পার্শ্বচরিত্রগুলোর সংলাপের দিকে খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাই, সাদুর বউয়ের এমন আচরণ গড়ে ওঠার কারণ, শৈশবের অনিরাপদ পরিবেশ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণজনিত সমস্যা।

কিশোর বয়সে জোরপূর্বক প্রথম বিয়ের অভিজ্ঞতা যৌনতার প্রতি তাঁর যে অনিহা তৈরি করে, সেটির ভুক্তভোগী হয় সাদু। দিনের পর দিন একান্ত সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ায় এক সময় স্ত্রীকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তালাকের মতো প্রচলিত রীতিতে না গিয়ে রেখে আসে দূরের জঙ্গলে। বলে রাখা দরকার, সাদুর চরিত্রটিও দিনশেষে একজন নিঃসঙ্গ মানুষের প্রতীক। মা-বাবা, ভাই-বোন নেই। ‘মিয়া ভাই’ নামে গ্রামের এক গৃহস্থের হয়ে কাজ করে। গরু চড়ায়, মাছের ঘের দেখাশোনা করে। তাঁর বসতবাড়িটিও গ্রাম থেকে কিছুটা দূরের নির্জন জায়গায়।

এক ভাদ্র মাসে মাঠে গরু চড়াতে গিয়ে সাদু তালগাছের নিচে পায় পাকা তাল। ঠিক সেদিনই জঙ্গলে রেখে আসা স্ত্রী বাড়ি ফিরে। পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা বানায়। সেই পিঠা খেয়ে সাদু নতুন করে বউয়ের মায়ায় পড়ে। নিজেই বলে, ‘বাপের জন্মে এমন পিঠা খাইনি’। এবার যৌন আকাঙক্ষা পূরণ না হলেও সাদুর পেটের চাহিদা মেটায় তালের পিঠা। তালের রস হয়ে ওঠে দুজন নিঃসঙ্গ মানুষের আপন হয়ে ওঠার মাধ্যম। এখানে খেয়াল করার বিষয়- স্ত্রীকে ত্যাগ করা কিংবা আপন করে নেওয়ার মতো দুই ধরনের সিদ্ধান্তই নিচ্ছে সাদু। অর্থাৎ, পুরুষ চরিত্র। তাঁর বউ যেন ‘কুটুম পাখি’। সমাজবিরুদ্ধ আচরণের কারণে যার মতামতটাও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

‘আঁখিতে জড়ানো কাজল কথা কয়’
গ্রীষ্ম শেষে প্রকৃতিতে আসে শীতকাল। হঠাৎ একদিন আগুন লাগে সাদুর বাড়িতে। নিজের ঘর হারিয়ে সাদু আবারও স্ত্রীকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এবার জঙ্গলে নয়, রেখে আসে বউয়ের মামার বাড়িতে। সাদুর বউয়ের ভাষায়, মামার বাড়িতে তাঁর শৈশব কেটেছে নির্যাতনের মধ্য দিয়ে।

এই বিদায় যাত্রার দৃশ্যে সাদুর বউয়ের আবেগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। বেদনার অনুভূতি নিয়ে স্বামীকে জানায়, এবার আর সে ফিরবে না। কিন্তু শীত শেষে বর্ষাকাল আসতেই সে স্বামীর কাছে ফিরে আসে। নিঃসঙ্গ সাদুর আবারও সঙ্গীর অভাব পূরণ হয়। আগুনে পোড়া ঘর মেরামতের উদ্যোগ নেই। ঠিক তখনই জানতে পারে তাঁর স্ত্রীর গর্ভে সন্তান এসেছে। স্ত্রীর সঙ্গে কখনোই একান্ত মুহূর্ত কাটানোর সুযোগ না পাওয়া সাদু এবার সেই সন্তান নষ্টের চেষ্টা করে। সন্দেহবশত একদিন স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘আমি যখন তোকে দূরে রেখে আসি, তখন কি তুই তোর আগের স্বামীর কাছে যাস?’ এই প্রশ্নের উত্তরে সাদুর বউয়ের সরাসরি কোনো সংলাপ নেই। পর্দায় আমরা কেবল তাঁর অপ্রস্তুত চাহনি দেখতে পাই। পরিচালক এই চাহনি থেকে উত্তর খুঁজে নেওয়ার ভার দর্শকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

দর্শক হিসেবে আপনি যদি সাদুর বউয়ের মানসিক অবস্থার খুঁটিনাটিতে মনোযোগী হন, তাহলে উত্তর পেলেও পেতে পারেন। মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের জীবন ও অনুভূতির প্রতি মনোযোগী হওয়ার সেই বার্তাই কি দিল রইদ?

সৌজন্যে: দৈনিক সমাকাল