জান্নাতের ‘ছাপ্পা’ এখন অনুপ্রেরণার গল্প

8

বাসস

ঢাকা (শনিবার,৬ জুন, ২০২৬) : দেশে অনলাইনভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। একসময় শখের বশে ব্লক প্রিন্টের নকশা করতেন যে তরুণী, আজ তিনিই সেই শখকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছেন একটি সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তিনি জান্নাত রফিক, আর তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ছাপ্পা’।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করা জান্নাত রফিকের স্বপ্নও ছিল অন্য সবার মতো একটি ভালো চাকরি পাওয়া। কিন্তু ভাগ্য যেন তাকে নতুন কিছু করার তাগিদ দিচ্ছিল। ভাগ্যই তাকে নিয়ে যায় উদ্যোক্তা হওয়ার পথে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান ‘ছাপ্পা’ দেশীয় পোশাক ও লাইফস্টাইল পণ্যের একটি পরিচিত নাম হিসেবে গড়ে উঠেছে।

শখ থেকেই যাত্রা

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ব্লক প্রিন্ট ও রঙের কাজের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্ম নেয় জান্নাতের। নিজের ডিজাইন করা ব্লকের জামা পরে ক্যাম্পাসে যেতেন তিনি। তার তৈরি পোশাক বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের নজর কাড়তে শুরু করে।

একদিন প্রতিবেশী এক নারী তার কাজ দেখে নিজের দুই সন্তানের জন্য জামা তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। সেই অনুরোধই হয়ে ওঠে উদ্যোক্তা জীবনের প্রথম পদক্ষেপ। এরপর কয়েকটি শাড়ি ডিজাইন করেন জান্নাত। পরিবার ও বন্ধুদের উৎসাহে ধীরে ধীরে একটি ব্র্যান্ড গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।প্রতিষ্ঠানের নামকরণও এসেছে কাজের ধরন থেকেই। কাঠের ব্লকে রং মেখে কাপড়ে ছাপ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই ‘ছাপ্পা’ নামটি নির্বাচন করা হয়।

চাকরি নাকি ব্যবসা : কঠিন সিদ্ধান্ত

জান্নাত রফিক জানান, পড়াশোনা শেষে পরিবারের প্রত্যাশা ছিল তিনি একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবেন। সামাজিকভাবেও এমন ধারণা ছিল যে আইবিএ থেকে পড়াশোনা করে ব্যবসার চেয়ে চাকরিই বেশি মর্যাদাপূর্ণ।

পরিবারের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেন। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে সময় ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যার মুখোমুখি হন।

সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় জান্নাত জানান, চাকরি থেকে পাওয়া মাসিক আয়ের তুলনায় তার ব্যবসা থেকে তিন থেকে চার গুণ বেশি আয় হচ্ছিল। একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের উদ্যোগেই হয়তো সম্ভাবনা বেশি। এরপর পরিবারকে বুঝিয়ে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।বর্তমানে তার মাসিক আয় দুই লাখ টাকারও বেশি, যা একজন মধ্যম পর্যায়ের করপোরেট চাকরিজীবীর আয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।

পরিবারের সমর্থনই শক্তি

নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে পারিবারিক সমর্থনকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জান্নাতের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।তিনি জানান, স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ির কাছ থেকে অসাধারণ সহযোগিতা পেয়েছেন। বিশেষ করে তার শাশুড়ি সংসারের অনেক দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যাতে জান্নাত ব্যবসার কাজে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন। জান্নাত বলেন, ‘পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া আমার পক্ষে এত দূর আসা সম্ভব হতো না। উদ্যোক্তা হওয়ার পথে পরিবারের বিশ্বাস ও উৎসাহ আমাকে সাহস জুগিয়েছে।’

ছোট উদ্যোগ থেকে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর লাব্বায়েক মোড়ে বর্তমানে ‘ছাপ্পা’র একটি শোরুম রয়েছে। প্রায় তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই শোরুম এখন স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে পরিচিত একটি গন্তব্য। শুরুতে শুধুমাত্র শাড়ি নিয়ে কাজ করলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কুর্তি, ব্লাউজ, শীতের চাদরসহ বিভিন্ন দেশীয় পোশাক উৎপাদন ও বিক্রি করছে। এর পাশাপাশি ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানি করছেন জান্নাত। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ট্রাভেল ব্যাগ, লেডিস ব্যাগ, ম্যাসাজার জুতো, ক্রোশেট পোশাক, শিশুদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, ধূপ বার্নার এবং সিরামিকের শোপিস।

নারীদের অন্তর্বাস নিয়ে কাজ করার জন্য ‘সিক্রেট এমব্রেস’ নামে আলাদা একটি অনলাইন গ্রুপও পরিচালনা করছেন তিনি।

নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কয়েক লাখ নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনা মহামারির পর অনলাইন ব্যবসা আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ সক্রিয় ফেসবুকভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা রয়েছে, যার বড় একটি অংশ নারী পরিচালিত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের মোট ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ সরাসরি নারী মালিকানাধীন। যদিও এই হার এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবুও গত এক দশকে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

আস্থাই ব্যবসার মূল ভিত্তি

অনলাইন ব্যবসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্রেতার আস্থা অর্জন করা। অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের ছবি ও বাস্তব পণ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় ক্রেতারা প্রতারিত হন।

তবে ‘ছাপ্পা’ শুরু থেকেই স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজে নিয়মিত উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভিডিও, পণ্যের বাস্তব ছবি এবং প্যাকেজিংয়ের দৃশ্য প্রকাশ করা হয়।

জান্নাতের মতে, ‘একজন ক্রেতা একবার প্রতারিত হলে সে আর ফিরে আসে না। তাই আমরা শুরু থেকেই পণ্যের প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’

বর্তমানে অনলাইন ব্যবসায় গ্রাহক ধরে রাখার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, দ্রুত ডেলিভারি ও বিক্রয়োত্তর সেবাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মানসম্মত পণ্য, সহনীয় দাম

‘ছাপ্পা’র ব্যবসায়িক কৌশলের অন্যতম দিক হলো মান বজায় রেখে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা। জান্নাত জানান, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়। এর ফলে উৎপাদন খরচ কমে এবং ক্রেতাদের কাছে তুলনামূলক কম দামে পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য স্বল্প লাভে বেশি গ্রাহক তৈরি করাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

অভিযোগকে উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখা

অনেক উদ্যোক্তা গ্রাহকের সমালোচনাকে নেতিবাচকভাবে নিলেও জান্নাত বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেন। তার ভাষায়, ‘গ্রাহকের অভিযোগ আমাদের জন্য শেখার সুযোগ। কোনো সমস্যা হলে আমরা দ্রুত যাচাই করি এবং প্রয়োজনীয় সমাধান দিই।’

এই গ্রাহকবান্ধব মনোভাবই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তিনি।

প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা

বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তারা এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ডিজিটাল মার্কেটিং ও পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত।

জান্নাত মনে করেন, সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল মার্কেটিং সহায়তা নিশ্চিত করে, তবে এ খাত আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি নিরাপদ অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা, কম খরচে পণ্য ডেলিভারি ও উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা তৈরির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

অনুপ্রেরণার নাম ‘ছাপ্পা’

শখ থেকে শুরু হওয়া একটি ছোট উদ্যোগ আজ একটি সফল ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। জান্নাত রফিকের গল্প শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোর এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

যেখানে অনেক তরুণ-তরুণী এখনও চাকরিকে একমাত্র সফলতার পথ হিসেবে দেখেন, সেখানে জান্নাত প্রমাণ করেছেন যে সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে একটি ছোট উদ্যোগও বড় স্বপ্নের ভিত্তি হতে পারে। ‘ছাপ্পা’র গল্প তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং বাংলাদেশের উদীয়মান নারী উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা ও সাফল্যের প্রতিচ্ছবি।