ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ নারীরা-এক

3235

সাবিহা হাসান

হজরত মুহম্মদ (সা.) বলেন,দুনিয়ার সব নারীর মধ্যে চারজন নারীর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তারা হলেন হজরত মরিয়ম (আ.), হজরত আসিয়া (আ.), হজরত খাদিজা (রা.) ও হজরত ফাতেমা (রা.)। এ ছাড়া ইসলামের ইতিহাসে আরও অসংখ্য নারী ছিলেন যারা জ্ঞানে, গুণে, সততা আর প্রজ্ঞায় এখনো সব নারীর জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস। ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠ নারীদের নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন।

হজরত খাদিজা (রা.)

আরবের কোরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হজরত খাদিজা (রা.)। তারপরও অত্যন্ত সাধারণ জীবন-যাপন করতেন তিনি। ইসলাম আবির্ভাবের আগে তিনি ইব্রাহিম (আ.)-এর ধর্ম বা একত্ববাদে বিশ্বাস করতেন। তিনি ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠধনীদের অন্যতম। তিনি ছিলেন হিজাজের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী। বিজ্ঞ ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খাদিজার। আধ্যাত্মিকতার প্রতি ঝোঁক ছিল তার। তৎকালীন সমাজে সৎকর্ম ও দানশীলতার ক্ষেত্রে হজরত খাদিজার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। তবে তিনি ছিলেন বিপত্নিক।

জানা যায়, তিনি সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের অপেক্ষায় ছিলেন এবং তিনি আরবের সচেতন ও শিক্ষিত প্রবীণদের কাছে শেষ নবীর নিদর্শন সম্পর্কে মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। কিন্তু নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে খাদিজার। তাঁর বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্বে নিয়োজিত হন তিনি। নব্যুয়ত প্রাপ্তির আগে মুহম্মদ (সা.) এর মেধা, মনন, সততা, নিষ্ঠা ও বাণিজ্য সামলানোর কৌশল তাকে মুগ্ধ করে। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে রয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তি। বাণিজ্য কাফেলা যাতায়াতের সময় ঘটেছে সব অলৌকিক ঘটনা। এই যুবকের গুণাবলিতে আকৃষ্ট হন তিনি।

এরপরই ৪০ বছর বয়সে তিনি ২৫ বছরের যুবক মুহম্মদকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। এ নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়। কারণ বড় বড় ব্যবসায় সমাজপতিরা ছিলেন এই বিদুষী নারীর পানি প্রার্থী। তিনি তাদের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে গরিব ও এতিম যুবক মুহাম্মদকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, এটা তৎকালীন সমাজ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এ বিষয়ে খাজিার বান্ধবী ‘নাফিসা বিনতে মানিয়্যা’ পুরো উদ্যোগ নেন। নবীজীর পরিবারের পক্ষে বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেলে নির্ধারিত তারিখে উভয় পক্ষের পরিবারের মুরুব্বী ও আত্মীয় পরিজনের উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের রীতি অনুযায়ী খুৎবা পাঠ করেন নবীজীর চাচা আবু তালিব। প্রাচীন আরবী গদ্য সাহিত্যে এ খুৎবা বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। যাই হোক খাদিজা নিজেই এ বিয়ের উভয় পক্ষের খরচ বহন করেন। তিনি দুই উকিয়া স্বর্ণমুদ্রা নবীজীর কাছে পাঠিয়ে দেন বিয়ের খরচ মিটানোর জন্য। বিয়ের দেন মোহর ধার্য্য হয় পাঁচ শ’স্বর্ণ মুদ্রা। এটা নবুয়্যত লাভের ১৫ বছর আগের ঘটনা। তখন খাদিজার (রা.) বয়স ছিল চল্লিশ ও নবীজীর বয়স ছিল ২৫ বছর। এর আগে খাদিজা (রা.) দু’টি বিয়ে হয়েছিল, তবে তা টেকেনি। এদিকে সম্পদহীন মুহম্মদ (সা.)-কে বিয়ে করায় এরপর থেকে অনেকেই নানাভাবে তাকে তাচ্ছিল্য করতে শুরু করেন। এমনকি কুরাইশ বংশের এক দল অহংকারী ও নিন্দুক মহিলা গরিব মুহাম্মদের প্রসঙ্গ টেনে তাকে কটাক্ষ করত। তবে এসব পাত্তা দিতেন না। তিনি শান্তভাবে উত্তর দিতেন, তাঁর মতো আর কেউ কি আছে? তাঁর মতো সচ্চরিত্রবান ও মর্যাদাবান দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিকে কি তোমরা চেনো? কিন্তু তাতে ওইসব মহিলার বিদ্বেষমাত্রা কমেনি। বরং তারা এত বেশি হিংসা পরায়ণ ছিল যে, খাদিজার সন্তান প্রসবের সময় বিন্দু পরিমাণ সহযোগিতাও কেউ করেনি।

বিয়ের পর নবীজী একসময় সংসার বিবাগী হয়ে পড়েন। হেরা পবর্তের গুহায় গিয়ে দিনের পর দিন ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে থাকেন। এসময় বিরক্ত না হয়ে খাদিজা (রা.) পরম মমতায় তার পাশে দাঁড়ান। এমনকি নিজে নবীজীর জন্য খানাপিনা নিয়ে হেরা গুহায় চলে যেতেন।

বিয়ের পনের বছর পর মুহম্মদ (সা.) নব্যুয়ত লাভ করেন। হেরা পবর্তের গুহায় হযরত জিব্রাইল (আ.)-এর মাধ্যমে নব্যুয়ত লাভের পর যখন তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন, তখন তিনি ছিলেন, ভীত-স্বন্ত্রস্ত। এসময় খাদিজা (রা.) তাকে কম্বলে জড়িয়ে ধরে রাখেন এবং সুস্থির অবস্থায় ফিরে এলে নবীজীকে বলেন, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। আপনার ওপর ওহী’ নাজেল হয়েছে। যার সাথে আপনার দেখা হয়েছে, তিনি জিব্রাইল ফেরেশতা। এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সমগ্র মেধা, মনন, আন্তরিকতা ও সম্পদ নিয়ে নবীজীর পাশে দাঁড়ান। তিনি ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁর সকল সম্পদ নবীজীকে উপহার দিয়েছিলেন। কোনো কারণে রাসুল (সাঃ)-এর মন খারাপ থাকলে তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতেন এবং সকল কাজে পরামর্শ দিতেন। নবুয়্যত প্রাপ্তির সপ্তম বছরে ইসলাম প্রচারের সাফল্য বৃদ্ধি পেতে থাকলে আরবের সমাজপতিরা মিলে ‘শোয়াবে আবু তালিব’ নামক উপত্যকায় নবীজী ও তাঁর নওমুসলমানদের অবরোধ করেন, তখন খাদিজ (রা.) নিজের সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে তাদের খাদ্য ও আর্থিক সহযোগিতা দেন। এক পর্যায়ে তাঁকেও অবরোধের মধ্যে পড়তে হয়। এসময় তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। এত সম্পদের মালিক হয়েও তিনি দীর্ঘদিন শুষ্ক এক উপত্যকায় কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করেছেন। ইসলামের জন্য তার অঢেল সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ওই উপত্যকায় কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করার কারণে খাদিজার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলেই তার মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়। নবীজীর সাথে ২৫ বছর দাম্পত্য জীবন যাপন করে ইসলামের এই মহীয়সী নারী ৬১৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ রমজান ৬৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

জান্নাতুল বাকিতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। নবীজী নিজেই তার লাশ কবরে নামান।

নবীজীর ঔরস্যে খাদিজা (রা:)- এর গর্ভে ছয় সন্তান জন্ম লাভ করেন। দুইপুত্র সন্তান শিশু কালেই বা হাটিহাটি অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। সর্ব কনিষ্ঠা সন্তানের নাম হজরত ফাতিমা (রা.)। খাদিজা (রা:) গর্ভে হজরত জয়নব (রা.), হজরত রুকাইয়া (রা.), হজরত উম্মে কুলসুম (রা.) নবীজীর অন্যতম সন্তান। এছাড়া খাদিজা (রা:) গর্ভে প্রথম স্বামীর ঘরে দুই ছেলে ও দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে এক মেয়ে ছিল। হজরত মারিয়ার গর্ভজাত সন্তান ইব্রাহীমও শিশুকালে ইন্তেকাল করেন।

সূত্র: বোখারী শরীফ, তাবকাত, সিরাতু ইবনে হিশাম, মুসনাদে আহমদ,হায়াতুস সাহাব।

রূপশ্রী/এমআরহক